চীনের ১৩ ফুটের দৈত্যাকার রোবট, তুলতে পারে ৫০০ কেজি ভার, প্রযুক্তিবিশ্বে তোলপাড়!
শিল্পকারখানার ভারী কাজ সহজ করতে চীনে প্রদর্শিত হয়েছে বিশাল মানবাকৃতির রোবট, যার নির্মাতাদের দাবি, এটি একসঙ্গে পাঁচশ কেজি পর্যন্ত ভার তুলতে সক্ষম।
চীনে ভারী শিল্পকারখানার কাজের জন্য তৈরি বিশাল আকৃতির এক মানবাকৃতির রোবট প্রযুক্তিবিশ্বে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। নিও১ নামের এই রোবটটির উচ্চতা প্রায় চার মিটার, অর্থাৎ ১৩ ফুটের কাছাকাছি। এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, রোবটটি প্রায় ৫০০ কেজি বা ১ হাজার ১০২ পাউন্ড পর্যন্ত ভার বহন করতে সক্ষম। প্রচলিত মানবাকৃতির রোবটের তুলনায় এর বিশাল আকার, শক্তিশালী জলচালিত ব্যবস্থা এবং শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের সম্ভাবনা এটিকে আলোচনায় এনেছে।
১৪ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইন্টারেস্টিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেইজিংভিত্তিক নিওড্রাডাইনামিকস রোবোটিকস এই রোবটটি তৈরি করেছে। সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের চীন আন্তর্জাতিক শিল্পমেলায় প্রতিষ্ঠানটি জেডি ইন্ডাস্ট্রিয়ালের সঙ্গে যৌথভাবে রোবটটি প্রদর্শন করে। পরবর্তী প্রতিবেদনেও রোবটটির উচ্চতা ও ভার বহনের ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এর উল্লেখযোগ্য কার্যক্ষমতার দাবিগুলো এখনো স্বাধীন পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা হয়েছে—এমন পাওয়া যায় নি ।
রোবটটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর আকার ও শক্তি উৎপাদনের ব্যবস্থা। সাধারণ মানবাকৃতির রোবটের উচ্চতা মানুষের কাছাকাছি রাখা হয়, যাতে সেগুলো মানুষের ব্যবহারের জন্য তৈরি পরিবেশে কাজ করতে পারে। কিন্তু নিও১ তৈরি করা হয়েছে ভারী শিল্পকারখানার চাহিদা মাথায় রেখে। প্রায় চার মিটার উচ্চতার এই যন্ত্রটির ওজন প্রায় ১ দশমিক ২ টন বলে বিভিন্ন প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এটি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ালে আকারের দিক থেকে সহজেই নজর কাড়বে।
এই রোবটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলচালিত প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক চালনা ব্যবস্থার সমন্বয়। প্রচলিত অনেক মানবাকৃতির রোবটে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়ার জন্য বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, জলচালিত ব্যবস্থায় তরলের চাপ কাজে লাগিয়ে শক্তি তৈরি করা হয়। যথাযথ নকশা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকলে এ প্রযুক্তি ভারী যন্ত্রাংশ সরানো এবং অধিক বল প্রয়োগের কাজে সুবিধা দিতে পারে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে নিও১ রোবটের ৩৯টি জলচালিত সংযোগব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে শক্তি সরবরাহ ও নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে সংযোগব্যবস্থার সংখ্যা বেশি হলেই রোবটটি সব পরিস্থিতিতে সমান দক্ষ হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে ভারসাম্য, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, শক্তির উৎস, যন্ত্রাংশের স্থায়িত্ব এবং বাস্তব পরিবেশে কাজ করার ক্ষমতার ওপর।
নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দাবি অনুযায়ী, নিও১-এর লক্ষ্য সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজ করা নয়; বরং ভারী শিল্পকারখানায় এমন কাজ সম্পন্ন করা, যেখানে বিপুল শক্তি প্রয়োজন হয় অথবা মানুষের জন্য পরিবেশটি ঝুঁকিপূর্ণ। খনিশিল্প, বন্দর, ভারী যন্ত্রাংশ সংযোজন এবং বিপজ্জনক শিল্পাঞ্চলে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে ভারী মালামাল স্থানান্তর, যন্ত্রাংশ ধরে রাখা এবং মানুষের প্রবেশ সীমিত এমন এলাকায় সহায়ক কাজ করার ক্ষেত্রে এ ধরনের রোবট ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সম্ভাব্য ব্যবহার আর বাস্তবে সফলভাবে কাজ করার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পাঁচশ কেজি ভার তোলার দাবি যাচাই করতে হলে জানতে হবে, রোবটটি কত উচ্চতায় ভার তুলতে পারে, কতক্ষণ সেটি ধরে রাখতে পারে এবং ভার তোলার সময় নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে কি না। একই সঙ্গে চলন্ত অবস্থায় ভার বহন, অসম মেঝেতে কাজ করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে থেমে যাওয়ার সক্ষমতাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু নির্দিষ্ট অবস্থায় ভার তোলার প্রদর্শনী দিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়।
নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১ দশমিক ২ টন ওজনের একটি যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ হারালে মানুষ, ভবন কিংবা আশপাশের যন্ত্রপাতির ক্ষতি হতে পারে। তাই এ ধরনের রোবটকে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের আগে সংঘর্ষ প্রতিরোধ, জরুরি থামানোর ব্যবস্থা, যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং কর্মীদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার মতো বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চীনে মানবাকৃতির রোবট উন্নয়নের পেছনে বৃহত্তর শিল্পপ্রতিযোগিতাও কাজ করছে। দেশটির বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন রোবট তৈরির চেষ্টা করছে, যেগুলো উৎপাদনকেন্দ্র, গুদাম, সেবাখাত এবং অন্যান্য বাস্তব পরিবেশে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, চীনের ডেক্সফোর্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রোবটকে বাস্তব কাজ শেখানোর জন্য কৃত্রিম পরিবেশে প্রশিক্ষণ ও অনুকরণভিত্তিক তথ্য ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর লক্ষ্য প্রশিক্ষণের ব্যয় কমানো এবং যন্ত্রকে নতুন পরিস্থিতিতে কাজ করার উপযোগী করে তোলা ।
নিও১-এর মতো বৃহদাকার রোবটের ক্ষেত্রে শুধু শক্তিশালী যন্ত্রাংশ থাকাই যথেষ্ট নয়। আশপাশের পরিবেশ বুঝতে পারা, নির্দেশ অনুসারে কাজ করা, বাধা শনাক্ত করা এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সংবেদক, নিয়ন্ত্রণপ্রযুক্তি এবং যান্ত্রিক নকশার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
নিও১ ভারী শিল্পকাজে মানবাকৃতির রোবট ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা। এর প্রায় চার মিটার উচ্চতা এবং পাঁচশ কেজি ভার বহনের ঘোষিত ক্ষমতা প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয়। তবে রোবটটি কতটা নির্ভরযোগ্য, কতটা নিরাপদ এবং বাস্তব শিল্পকারখানায় কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারণের জন্য আরও স্বাধীন পরীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারিক প্রমাণ প্রয়োজন। আপাতত এটিকে সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রযুক্তি হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত; নির্মাতার দাবিকে সম্পূর্ণ প্রমাণিত সক্ষমতা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।





