মাইকেল জর্ডানের জার্সি বিক্রি ১৪০০ কোটি টাকায়, গড়ল নতুন বিশ্বরেকর্ড
৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের বাস্কেটবল ইতিহাসে নিজের নাম আগেই অমর করে রেখেছেন মাইকেল জর্ডান। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার দুই দশকেরও বেশি সময় পরও তাঁর নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে এক ঐতিহাসিক বিক্রির কারণে। শিকাগো বুলসের হয়ে ১৯৯৮ সালের জাতীয় বাস্কেটবল প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে পরা তাঁর একটি লাল জার্সি বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে হিসাব করলে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৭০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ১৪০০ কোটি টাকা নয়, সঠিক আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৭১ কোটি টাকা।
১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের নিলাম প্রতিষ্ঠান হান্ট অকশনস এই বিক্রির তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, জার্সিটি সরাসরি নিলামে দর হাঁকানোর মাধ্যমে নয়, বরং ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ব্যক্তিগত সমঝোতার ভিত্তিতে বিক্রি হয়েছে। এ ধরনের বিক্রিতে দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে মূল্য নির্ধারণ করে চুক্তি সম্পন্ন করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাস্কেটবল-সংশ্লিষ্ট স্মারকসামগ্রীর ক্ষেত্রে এত বেশি দামে বিক্রির নজির আগে ছিল না। জার্সিটির ক্রেতা মায়ামিভিত্তিক আবাসন ব্যবসায়ী ও পুরোনো ক্রীড়া স্মারক সংগ্রাহক রন ফারম্যান। তিনি জার্সিটি কেনার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানান, বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের কাছে জর্ডান অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ক্রীড়াবিদ। তাঁর মতো কিংবদন্তির ঐতিহাসিক জার্সি সংগ্রহ করতে পেরে তিনি আনন্দিত। তবে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পেছনে কেবল একজন খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তাই কাজ করেনি; জার্সিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাস্কেটবল ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। জার্সিটি মাইকেল জর্ডান পরেছিলেন ১৯৯৮ সালের ৫ জুন। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্টলেক সিটিতে শিকাগো বুলসের মুখোমুখি হয়েছিল ইউটাহ জ্যাজ। এটি ছিল সাত ম্যাচের চূড়ান্ত সিরিজের দ্বিতীয় খেলা। প্রথম খেলায় হারের পর বুলসের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই ম্যাচে জর্ডান করেন ৩৭ পয়েন্ট। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বুলস ৯৩-৮৮ ব্যবধানে জয় পায় এবং সিরিজে সমতা ফেরায়। এই একটি ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জার্সিটিই প্রায় ২৮ বছর পর এমন অবিশ্বাস্য মূল্যে বিক্রি হলো। জার্সিটির বিশেষত্ব শুধু এটি যে জর্ডান ম্যাচে পরেছিলেন, তা নয়। এতে তাঁর স্বাক্ষরও রয়েছে। নিলাম প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, জার্সিটির ইতিহাস ও সত্যতা যাচাই করতে একাধিক প্রমাণপত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ছবি মিলিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, ১৯৯৮ সালের চূড়ান্ত পর্বের দ্বিতীয় খেলাতেই জর্ডান এটি পরেছিলেন। তাঁর স্বাক্ষরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। ফলে এটি কেবল একটি পুরোনো পোশাক নয়; বরং নির্দিষ্ট ম্যাচ, খেলোয়াড় এবং ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত একটি সংগ্রহযোগ্য স্মারক।
জার্সিটির মালিকানার ধারাবাহিকতাও এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। হান্ট অকশনসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে শিকাগো বুলসের কাছ থেকে একজন ব্যক্তিগত সংগ্রাহক এটি কিনেছিলেন। এরপর জার্সিটি মূল ক্রেতার কাছ থেকে মাত্র একবার অন্যের হাতে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে মালিকানার এই সীমিত পরিবর্তন এবং সংরক্ষিত নথিপত্র জার্সিটির বিশ্বাসযোগ্যতা ও সংগ্রহযোগ্য মূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। মূল্যবান ক্রীড়া স্মারক কেনাবেচায় কোনো বস্তু কোথা থেকে এসেছে, কে ব্যবহার করেছেন এবং কীভাবে সেটি বর্তমান মালিকের কাছে পৌঁছেছে এসব তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৮ সালের ওই চূড়ান্ত পর্ব ছিল জর্ডান ও শিকাগো বুলসের জন্য ঐতিহাসিক এক সময়। দলটি শেষ পর্যন্ত ছয়টি খেলায় সিরিজ জিতে ইউটাহ জ্যাজকে হারায়। এর মধ্য দিয়ে জর্ডান নিজের ষষ্ঠ ও শেষ জাতীয় বাস্কেটবল শিরোপা অর্জন করেন। একই সঙ্গে তিনি চূড়ান্ত পর্বের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও পান। নব্বইয়ের দশকে শিকাগো বুলসের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তাঁর নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দলের হয়ে তাঁর ছয়টি শিরোপা জয় তাঁকে বাস্কেটবলের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের আলোচনায় স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।
জর্ডানের শেষ শিরোপা জয়ের মৌসুমটি পরবর্তী সময়ে আরও বেশি পরিচিতি পায় ২০২০ সালে প্রকাশিত দশ পর্বের প্রামাণ্য ধারাবাহিক ‘দ্য লাস্ট ড্যান্স’-এর মাধ্যমে। সেখানে শিকাগো বুলসের ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমের নানা ঘটনা, খেলোয়াড়দের সম্পর্ক, প্রতিযোগিতার চাপ এবং শিরোপা জয়ের যাত্রা তুলে ধরা হয়। এই ধারাবাহিক নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও জর্ডানের শেষ শিরোপা জয়ের গল্প পৌঁছে দেয়। ফলে ওই মৌসুমের সঙ্গে সম্পর্কিত জার্সি, জুতা, ছবি ও অন্যান্য স্মারকের প্রতি সংগ্রাহকদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
এটি অবশ্য ১৯৯৮ সালের চূড়ান্ত পর্বের প্রথম জার্সি নয়, যা কোটি কোটি ডলারে বিক্রি হলো। একই সিরিজের প্রথম খেলার একটি লাল জার্সি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তৃতীয় খেলার একটি সাদা জার্সি বিক্রি হয় ১ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে। এবার দ্বিতীয় খেলার জার্সিটি ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারে বিক্রি হওয়ায় আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, একই চূড়ান্ত পর্বের তিনটি জার্সিই এখন ১ কোটি ডলারের বেশি দামে বিক্রির নজির গড়েছে।
তবে ক্রীড়া স্মারকসামগ্রীর সর্বোচ্চ বিক্রিমূল্যের তালিকায় জর্ডানের এই জার্সি এখনো প্রথম স্থানে নেই। সেই অবস্থান ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বেসবল কিংবদন্তি বেব রুথের একটি ঐতিহাসিক জার্সি। ১৯৩২ সালের বিশ্ব সিরিজে নিউইয়র্ক ইয়াঙ্কিজের হয়ে পরা সেই জার্সি ২০২৪ সালে ২ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছিল। ওই ম্যাচে রুথের বিখ্যাত হোম রান এবং সেটিকে ঘিরে প্রচলিত ঐতিহাসিক কাহিনির কারণে জার্সিটির গুরুত্ব অনেক বেশি। ফলে জর্ডানের ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জার্সিটি বাস্কেটবল স্মারকসামগ্রীর নতুন রেকর্ড গড়লেও সব ধরনের ক্রীড়া স্মারকের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামের জার্সি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জর্ডানের জার্সির এই বিক্রি আরও একটি বিষয় সামনে এনেছে। বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত সামগ্রী এখন অনেক সংগ্রাহকের কাছে শুধু আবেগের স্মারক নয়, বরং বিরল সম্পদ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কোনো জার্সি যদি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যবহৃত হয়, খেলোয়াড়ের স্বাক্ষর থাকে, সত্যতা যাচাই করা যায় এবং মালিকানার ইতিহাস নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে সেটির মূল্য সাধারণ স্মারকের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। তবে সব স্মারকের দাম একইভাবে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ক্রেতার আগ্রহ, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সত্যতা এবং বাজারের চাহিদার ওপর মূল্য নির্ভর করে।
খেলোয়াড়ি জীবনে জর্ডান যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, অবসরের বহু বছর পরও তা তাঁর স্মারকের বাজারমূল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। ১৯৯৮ সালের সেই লাল জার্সি একদিকে যেমন বুলসের শেষ শিরোপা জয়ের স্মৃতি বহন করছে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্ব ক্রীড়া ইতিহাসে জর্ডানের স্থায়ী প্রভাবেরও একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁর মাঠের সাফল্য, ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের আগ্রহ মিলেই এই জার্সিকে সংগ্রাহকদের কাছে অসাধারণ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের এই বিক্রি তাই শুধু একটি পোশাকের মূল্য নির্ধারণের ঘটনা নয়; এটি ক্রীড়া ইতিহাস, স্মৃতি এবং কিংবদন্তির বাণিজ্যিক গুরুত্বেরও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।