যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক আলোচনায় হেগসেথকে যুদ্ধবিরোধীদের প্রতিবাদ, নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে বহিষ্কার
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে সামরিক সম্মেলনে ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্যে বাধা দেন বিক্ষোভকারীরা, পরে তাঁদের বের করে দেয় নিরাপত্তাকর্মীরা।
যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক আলোচনায় হেগসেথকে যুদ্ধবিরোধীদের প্রতিবাদ, নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে বহিষ্কার
৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে সামরিক বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্যের সময় একের পর এক বিক্ষোভে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের প্রতিবাদ জানাতে সম্মেলনে উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা তাঁকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও ‘কাপুরুষ’ বলে আখ্যা দেন। তাঁদের বক্তব্যের মধ্যে ছিল গাজায় শিশুদের দুর্ভোগ, ইরানে হামলা এবং যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিরোধিতা। পরে সম্মেলনের নিরাপত্তাকর্মীরা ছয়জন বিক্ষোভকারীকে একে একে কক্ষ থেকে বের করে দেন। তাঁদের মধ্যে এক নারীকে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী মিলে বহন করে বাইরে নিয়ে যান।
১৪ অক্টোবর বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বার্ষিক সম্মেলন ও প্রদর্শনীতে এ ঘটনা ঘটে। সেখানে সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রতিরক্ষা খাতের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনের একটি আলোচনায় অংশ নেন হেগসেথ এবং সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। আলোচনার মূল বিষয় ছিল ভবিষ্যৎ যুদ্ধে চালকবিহীন আকাশযান, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র এবং রোবটনির্ভর সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। কিন্তু বক্তব্য শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতিবাদে আলোচনাটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনার প্রথম ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে একাধিকবার বিক্ষোভকারীরা নিজেদের আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ছয়জনের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, কয়েকটি প্রতিবেদনে প্রথম আধা ঘণ্টায় অন্তত পাঁচবার বক্তব্যে বাধা দেওয়ার তথ্য এসেছে। ফলে বিক্ষোভের সংখ্যা ও সময়ের বর্ণনায় সামান্য পার্থক্য থাকলেও একাধিকবার প্রতিবাদ এবং ছয়জনকে বের করে দেওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে সমর্থিত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যে উঠে আসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের দুর্দশার প্রসঙ্গ। একজন বিক্ষোভকারী হেগসেথকে উদ্দেশ করে বলেন, তিনি যোদ্ধা নন, বরং কাপুরুষ। একই সঙ্গে গাজার শিশুরা অনাহারে ভুগছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। আরেকজন বিক্ষোভকারী অভিযোগ করেন, সামরিক হামলায় তাঁর পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্য একজন হেগসেথকে যুদ্ধাপরাধী ও নাৎসি বলে আখ্যা দেন এবং তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির দাবি জানান। এসব বক্তব্য ছিল বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ; এগুলোকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিক্ষোভের প্রথম দিকে হেগসেথ তুলনামূলকভাবে হালকা মন্তব্য করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। এক নারী প্রতিবাদ জানালে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে মন্তব্য করেন, ওই নারী তাঁকে বেশ পছন্দ করেন বলে মনে হচ্ছে। তাঁর এ মন্তব্যের পর উপস্থিত কয়েকজনের হাসি ও হাততালি শোনা যায়। তবে একের পর এক বিক্ষোভকারী উঠে দাঁড়িয়ে বক্তব্যে বাধা দিতে থাকলে তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বিরক্তির ছাপ বাড়তে থাকে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে হেগসেথ মন্তব্য করেন, মনে হচ্ছে এটি একটি আংশিক সমন্বিত কৌশল। অর্থাৎ, বিক্ষোভকারীরা আলাদা আলাদা সময়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে আলোচনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত করছেন বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। তবে বিক্ষোভকারীদের প্রত্যেকে কীভাবে সম্মেলনে প্রবেশ করেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে আগে থেকে কী ধরনের সমন্বয় হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
প্রতিবাদ চলাকালে সম্মেলনকক্ষের পরিবেশও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে বের করে নেওয়ার সময় উপস্থিত দর্শকদের একাংশ ‘যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাষ্ট্র’ বলে স্লোগান দেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীরা যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য ও বিভিন্ন দাবি তুলে ধরতে থাকেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার পরও আলোচনায় কিছু সময় বিঘ্ন ঘটে। শেষ পর্যন্ত বক্তারা তাঁদের আলোচনা চালিয়ে যান। এ ঘটনা সামরিক বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে যুদ্ধনীতি নিয়ে প্রকাশ্য মতবিরোধের চিত্র তুলে ধরেছে। বিক্ষোভের দায়িত্ব স্বীকার করেছে যুদ্ধবিরোধী সংগঠন কোডপিঙ্ক এবং ইরানি-আমেরিকান অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় ইরানি-আমেরিকান পরিষদ। সংগঠনগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের কর্মী ও সমর্থকেরা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত নীতির প্রতিবাদ জানাতে সম্মেলনে অংশ নেন। জাতীয় ইরানি-আমেরিকান পরিষদের যোগাযোগবিষয়ক ব্যবস্থাপক ইসাবেলা জাভিদানও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। কোডপিঙ্কের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে আরও কয়েকটি সংগঠনের কর্মী ও সমর্থকেরা প্রতিবাদে যুক্ত ছিলেন। কোডপিঙ্ক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করে আসছে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সময়কার যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সংগঠনটির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। অন্যদিকে, জাতীয় ইরানি-আমেরিকান পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানি বংশোদ্ভূত মানুষের অধিকার ও নীতিগত স্বার্থ নিয়ে কাজ করে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে সংগঠনটি এ যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছে। ফলে ওয়াশিংটনের এ বিক্ষোভকে শুধু একটি সম্মেলনে বাধা দেওয়ার ঘটনা হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিবাদের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আয়োজক সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী-সংশ্লিষ্ট সমিতি জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার মৌলিক হলেও সম্মেলনে নিবন্ধন করে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট আচরণবিধি মেনে চলতে হয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার মধ্যে এভাবে চিৎকার করে বাধা দেওয়া ওই আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। নিরাপত্তাকর্মী ও মহানগর পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপের ফলে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে বলেও আয়োজকেরা উল্লেখ করেছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যে উত্থাপিত যুদ্ধনীতি ও মানবিক সংকটের প্রশ্নগুলো সম্পর্কে আয়োজকদের বিবৃতিতে বিস্তারিত জবাব দেওয়া হয়নি। সম্মেলনের আলোচনায় শুধু যুদ্ধের প্রতিবাদ নয়, সামরিক প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। আলোচনার নাম ছিল ‘প্রজেক্ট অ্যাজিনকোর্ট’। এটি পেন্টাগনের এমন একটি উদ্যোগ, যার লক্ষ্য স্বয়ংক্রিয় সামরিক ব্যবস্থা ও আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির উন্নয়ন এবং ব্যবহার ত্বরান্বিত করা। এর মধ্যে রয়েছে চালকবিহীন আকাশযান, রোবট এবং মানুষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে সক্ষম স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক যুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক রয়েছে। এসব প্রযুক্তি সামরিক বাহিনীর ঝুঁকি কমাতে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে বলে সমর্থকেরা মনে করেন। অন্যদিকে, প্রযুক্তির ভুল সিদ্ধান্তে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, দায় নির্ধারণের জটিলতা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সমালোচকেরা। ওয়াশিংটনের সম্মেলনে বিক্ষোভকারীরা সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে ইরান ও গাজার মানবিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে প্রতিবাদ জানান। তবে আলোচনায় উত্থাপিত সব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য পৃথক প্রমাণ ও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচনায় হেগসেথের সঙ্গে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের পাশাপাশি ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রতিরক্ষা খাতের কাজের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় আসে। অর্থাৎ, অনুষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ যুদ্ধপ্রযুক্তির উন্নয়ন, সংগ্রহ এবং সামরিক বাহিনীতে তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা। বিক্ষোভের কারণে আলোচনায় বিঘ্ন ঘটলেও অনুষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধনীতি, সামরিক ব্যয় এবং জনসমক্ষে প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে সম্মেলনের আয়োজকেরা নির্ধারিত নিয়ম মেনে অনুষ্ঠান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা সামরিক অভিযান ও তার মানবিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ইরানে প্রাণহানি, গাজায় শিশুদের দুর্ভোগ এবং অস্ত্র উৎপাদন ও যুদ্ধ পরিচালনায় বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও নির্দিষ্ট অভিযোগের দায় ও সত্যতা নির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বাধীন তদন্ত এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।