চীনের কাছ থেকে ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ, ২ শতাংশ সুদে আধুনিক হচ্ছে মোংলা বন্দর
২ শতাংশ সুদে চীনের ৩৩৬ মিলিয়ন ডলারের ঋণে মোংলা বন্দরে নির্মিত হবে দুটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, বাড়বে পণ্য পরিচালনার সক্ষমতা।
বাংলাদেশের মোংলা বন্দরের অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক। বার্ষিক ২ শতাংশ সুদের এই ঋণ ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর দুই দেশের পক্ষে ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্মসচিব আলিয়া মেহের এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফেংজুন তিয়ান।
চুক্তির আওতায় ২.৪০৪ বিলিয়ন চীনা ইউয়ান ঋণ দেবে চীনের এক্সিম ব্যাংক। মার্কিন ডলারে এর পরিমাণ ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পটির আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কনটেইনার সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য ইয়ার্ড এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে ব্যবহৃত কার্গো হ্যান্ডলিং অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে মোংলা বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিকায়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বন্দরের সড়ক ও নৌযোগাযোগ, কাস্টমস কার্যক্রম, পণ্য পরিবহনব্যবস্থা এবং পরিচালন দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল আরও কার্যকর হতে পারে।
ঋণের সুদের হার বার্ষিক ২ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর হওয়ায় বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ পাচ্ছে। তবে গ্রেস পিরিয়ডের পর কিস্তি পরিশোধের নির্দিষ্ট সূচি, অন্যান্য সম্ভাব্য ফি এবং ঋণের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক শর্ত সম্পর্কে প্রকাশিত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে ঋণের মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নকারী দেশ। পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোর বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন রয়েছে। মোংলা বন্দরের নতুন ঋণচুক্তিও দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতার অংশ।
বন্দরটির আঞ্চলিক গুরুত্বও রয়েছে। বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন এই বন্দর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আঞ্চলিক পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেডের সঙ্গে মোংলা বন্দরের একটি টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে পৃথক চুক্তি রয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে চীনের নতুন ঋণচুক্তি থেকে বাংলাদেশের আঞ্চলিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই।
প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ, সম্পন্ন হওয়ার সময়সীমা এবং আধুনিকায়নের পর বন্দরের বার্ষিক পণ্য পরিচালনার সক্ষমতা কতটা বাড়বে—এসব বিষয়ে প্রকাশিত ঘোষণায় বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার এবং বন্দর পরিচালনার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর। একই সঙ্গে ঋণের বিপরীতে কতটা বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে, তা মূল্যায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।





