ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশাল কুমড়ার লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন ট্রাভিস, বিশ্বরেকর্ডের দৌড়ে নতুন চমক
ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশাল কুমড়ার প্রতিযোগিতায় ১ হাজার ৮৩ কেজির কুমড়া নিয়ে শিরোপা জিতেছেন ট্রাভিস গিয়েঙ্গার, তবে বিশ্বরেকর্ডের লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন অন্য চাষি।
ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশাল কুমড়ার লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন ট্রাভিস, বিশ্বরেকর্ডের দৌড়ে নতুন চমক
৫ মিনিটে পড়ুন
ক্যালিফোর্নিয়ার হাফ মুন বে শহরে ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৫৩তম বার্ষিক বিশাল কুমড়া ওজন প্রতিযোগিতায় মিনেসোটার উদ্যানতত্ত্ব শিক্ষক ট্রাভিস গিয়েঙ্গার আবারও সেরার মুকুট জিতেছেন। তাঁর উৎপাদিত ‘রকি’ নামের বিশাল কুমড়াটির ওজন ছিল ২ হাজার ৩৮৯ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৮৩ কেজি। প্রতিযোগিতায় এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের পঞ্চম শিরোপা অর্জন করেছেন। তবে এবারের প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল বিশ্বরেকর্ডের সাম্প্রতিক পরিবর্তন। ইংল্যান্ডে নতুন রেকর্ড গড়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডে তার চেয়েও ভারী একটি কুমড়ার খবর সামনে আসে। ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিযোগিতা জিতেও বিশ্বরেকর্ডের শীর্ষস্থান অধরা থেকে যায় গিয়েঙ্গারের।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ফ্রান্সিসকোর দক্ষিণে অবস্থিত হাফ মুন বে শহরে প্রতিবছর শরৎকালে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিশাল আকৃতির কুমড়া উৎপাদনকারী চাষিদের কাছে এটি বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এ বছর অন্তত ৩০ জন চাষি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের উৎপাদিত কুমড়ার ওজন দিয়ে বিচারকদের মুগ্ধ করা, পুরস্কার জেতা এবং সম্ভব হলে বিশ্বরেকর্ডের তালিকায় নিজেদের নাম লেখানো। প্রতিযোগিতাটি স্থানীয় মানুষের কাছেও বেশ জনপ্রিয়। কুমড়ার অস্বাভাবিক আকার, চাষিদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং ওজন মাপার উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত দেখতে সেখানে দর্শকদের ভিড় জমে। গিয়েঙ্গারের জন্য এবারের সাফল্য ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগের বছর কুমড়া চাষের সময় তাঁর বিশাল কুমড়াটি ফেটে যাওয়ায় তিনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি। ফলে এবার ফিরে এসে আবার শিরোপা জয় করা তাঁর জন্য ছিল প্রত্যাবর্তনের গল্প। পেশায় তিনি উদ্যানতত্ত্বের শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের বাড়ির আঙিনায় বিশাল কুমড়া উৎপাদনের কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই চর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বড় কুমড়া উৎপাদনের কৌশল, গাছের পরিচর্যা এবং ফলের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এবারের কুমড়াটি প্রতিযোগিতায় নিয়ে আসাও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মিনেসোটা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়েঙ্গার ও তাঁর পরিবারকে প্রায় ৩৫ ঘণ্টা গাড়িতে ভ্রমণ করতে হয়। এত বড় একটি কুমড়া সাধারণ ফলের মতো গাড়িতে তুলে নেওয়া সম্ভব নয়। পরিবহনের সময় কুমড়ার গায়ে চাপ পড়লে বা আঘাত লাগলে সেটি ফেটে যেতে পারে। তাই সতর্কভাবে বহন করা এবং কুমড়াটিকে অক্ষত অবস্থায় প্রতিযোগিতার মঞ্চে পৌঁছে দেওয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবার চাষের মৌসুমেও তাঁকে প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে। মিনেসোটায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যাওয়ায় কুমড়ার বৃদ্ধি ও পরিচর্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সাধারণত বিশাল কুমড়া উৎপাদনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে গাছের যত্ন, মাটির উর্বরতা বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ এবং আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচর্যা করা প্রয়োজন। তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। তারপরও গিয়েঙ্গার এমন একটি কুমড়া উৎপাদন করতে সক্ষম হন, যার ওজন তাঁকে আবারও প্রতিযোগিতার শীর্ষে পৌঁছে দেয়।
প্রতিযোগিতার আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, কুমড়ার অস্বাভাবিক আকার দেখে আগেই ধারণা করা হয়েছিল, এটি বিশ্বরেকর্ডের দাবিদার হতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণের জন্য ওজন মাপাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতায় গিয়েঙ্গারের কুমড়ার ওজন দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৮৯ পাউন্ডে। এই সাফল্যের জন্য প্রতি পাউন্ডে ৯ ডলার হিসাবে তিনি মোট ২১ হাজার ৫০১ ডলার পুরস্কার পান। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে। বিশ্বরেকর্ড গড়তে পারলে অতিরিক্ত ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার পাওয়ার সুযোগও ছিল। কিন্তু সেই অতিরিক্ত পুরস্কার তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। বিশ্বরেকর্ডের প্রতিযোগিতায় এবারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ইংল্যান্ডের চাষি ইয়ান প্যাটনের হাত ধরে। ৩ অক্টোবর ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের ওয়ারগ্রেভে অনুষ্ঠিত বিশাল সবজি ওজনের আয়োজনে তাঁর উৎপাদিত ‘বাঘিরা’ নামের কুমড়ার ওজন রেকর্ড করা হয় ২ হাজার ৮৫৬ দশমিক ৮ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ২৯৬ কেজি। গিনেস বিশ্বরেকর্ড কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেট পাম্পকিন কমনওয়েলথের অনুমোদনের পর এই ওজন বিশ্বের সবচেয়ে ভারী কুমড়ার রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে ইয়ান প্যাটন তাঁর যমজ ভাই স্টুয়ার্ট প্যাটনের সঙ্গে উৎপাদিত ‘মাগল’ নামের কুমড়ার মাধ্যমে রেকর্ড গড়েছিলেন। এবারের কুমড়া সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়। তবে ঘটনাপ্রবাহ এখানেই শেষ হয়নি। ইংল্যান্ডে নতুন রেকর্ড ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের গ্রিনে চাষি রন ওয়ালেসের উৎপাদিত একটি বিশাল কুমড়া ৩ হাজার ১৫৬ পাউন্ড বা প্রায় ১ হাজার ৪৩২ কেজি ওজনের বলে প্রতিযোগিতায় জানানো হয়। এই ওজন ইংল্যান্ডে সদ্য প্রতিষ্ঠিত রেকর্ডের চেয়েও অনেক বেশি। তবে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গিনেস বিশ্বরেকর্ড কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক যাচাই তখনও সম্পন্ন হয়নি। সে কারণে ওয়ালেসের কুমড়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বিশ্বরেকর্ডধারী বলা এবং যাচাইয়ের অপেক্ষায় থাকা ফলাফলকে স্বীকৃত রেকর্ড হিসেবে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এবারের প্রতিযোগিতায় গত বছরের বিজয়ী ব্র্যান্ডন ডসনও অংশ নিয়েছিলেন। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা রোজার বাসিন্দা। ২০২৫ সালে তাঁর উৎপাদিত কুমড়ার ওজন ছিল ২ হাজার ৩৪৬ পাউন্ড, যা তাঁকে শিরোপা এনে দিয়েছিল। কিন্তু এবার গিয়েঙ্গারের ২ হাজার ৩৮৯ পাউন্ড ওজনের কুমড়া প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করে। প্রতিযোগিতায় শুধু ওজনই নয়, কুমড়ার গঠন, আকৃতি এবং উৎপাদনের দক্ষতা নিয়েও দর্শকদের আগ্রহ দেখা যায়। আয়োজনে সবচেয়ে সুন্দর ও সুষম আকৃতির কুমড়ার জন্যও আলাদা স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এ ধরনের বিশাল কুমড়া উৎপাদনের পেছনে দীর্ঘ সময়ের শ্রম রয়েছে। সাধারণ কুমড়ার তুলনায় এগুলোর জন্য বিশেষ বীজ নির্বাচন, গাছের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মাটিতে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ফলের বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া চাষিরা সাধারণত ফলের আকার ও ওজন বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। তাই এসব কুমড়া দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সাধারণ রান্নার জন্য উৎপাদিত কুমড়ার মতো স্বাদ বা গুণাগুণকে প্রধান বিবেচনা করা হয় না। এগুলো মূলত প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার জন্যই বড় করা হয়। হাফ মুন বে শহরের এই আয়োজন স্থানীয় শরৎকালীন উৎসবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি খাবারের দোকান, সংগীত এবং বিভিন্ন কুমড়াকেন্দ্রিক আয়োজন দর্শকদের আকৃষ্ট করে। বিজয়ী কুমড়াকে শহরের আসন্ন শোভাযাত্রায় প্রদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এভাবে কৃষিকাজকে ঘিরে তৈরি হওয়া উৎসবটি স্থানীয় সংস্কৃতি ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বিশাল কুমড়া দেখতে আসা দর্শকদের জন্য এটি যেমন আনন্দের উপলক্ষ, তেমনি চাষিদের জন্য নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ।