ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অঘোষিত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বিশ্বকাপ আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অঘোষিত অর্থ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে; ফিফা বলছে, অর্থপ্রদান ছিল নিয়মসঙ্গত।
ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের তথ্য প্রকাশ না করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এফডব্লিউসি২০২৬ ইউএস ইনকরপোরেটেডের কাছ থেকে ইনফান্তিনো ১৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার পেয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ ফিফার প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে তাঁর ঘোষিত পারিশ্রমিকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্কাই স্পোর্টসও ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দ্য টাইমসের অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে একই তথ্য জানিয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইনফান্তিনোর ঘোষিত বেতন ছিল প্রায় ৫১ লাখ মার্কিন ডলার। এর বাইরে বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অতিরিক্ত ১৭ লাখ ৬০ হাজার ডলারের তথ্য ফিফার বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে তাঁর মোট পারিশ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থপ্রদানের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ ও প্রকাশ করা হয়েছিল, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়টি বুঝতে হলে ঘোষিত বেতন এবং অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের মধ্যে পার্থক্য বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ পাওয়া মানেই তা অবৈধ বা দুর্নীতির অর্থ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অর্থটি কোন চুক্তির আওতায় দেওয়া হয়েছিল, এর প্রকৃতি কী ছিল, সংশ্লিষ্ট নিয়মে তা প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা ছিল কি না এবং অর্থপ্রদান যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল কি না, সেসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।
ফিফা অবশ্য অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটি দাবি করেছে, সভাপতির পারিশ্রমিক ও চুক্তিভিত্তিক সুবিধাগুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হয়। ফিফার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অর্থপ্রদান গোপন বা অননুমোদিত ছিল না। তবে অতিরিক্ত অর্থের তথ্য কেন বার্ষিক প্রতিবেদনে আলাদাভাবে দেখা যায়নি, সেই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা জনসমক্ষে কতটা এসেছে, তা নিয়েই মূল বিতর্ক।
ফিফা ২০১৬ সাল থেকে সভাপতির বেতন, বোনাস ও বিভিন্ন ভাতার তথ্য বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের পারিশ্রমিক সম্পর্কে সদস্য দেশ, ফুটবলপ্রেমী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। সেই প্রেক্ষাপটে ঘোষিত বেতনের বাইরে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের তথ্য প্রতিবেদনে না থাকার অভিযোগটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অর্থের উৎস এফডব্লিউসি২০২৬ ইউএস ইনকরপোরেটেড, যা যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। এই বৃহৎ আয়োজনের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ইনফান্তিনোকে অর্থ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট চুক্তি, অর্থের শ্রেণিবিন্যাস এবং প্রকাশের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই ছাড়া কোনো অনিয়মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে আরও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, অতিরিক্ত অর্থের কোনো অংশ ইনফান্তিনোর মিয়ামিতে আবাসনসংক্রান্ত ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিলাসবহুল বাসস্থান ভাড়া এবং পরবর্তী সময়ে বহুমূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট কেনার প্রসঙ্গ এসেছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। সম্পত্তির মালিকানা, অর্থের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র যাচাই করেই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
ফিফার শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। সংস্থাটির বাণিজ্যিক অধিকার ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বকাপের আর্থিক পরিকল্পনা নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে মতবিরোধ দেখা গেছে। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা এর আগে ফিফার বাণিজ্যিক সম্পদে বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার একটি প্রস্তাবের স্বচ্ছতা ও মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। সেই প্রস্তাব পরে প্রত্যাহার করা হয়। তবে ওই বিতর্ক এবং ইনফান্তিনোর পারিশ্রমিকসংক্রান্ত বর্তমান অভিযোগ পৃথক বিষয়; একটির কারণে অন্যটির অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।
বর্তমান অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইনফান্তিনোর অতিরিক্ত অর্থপ্রাপ্তির বিষয়টি ফিফার অভ্যন্তরীণ নিয়ম অনুযায়ী যথাযথভাবে অনুমোদিত হয়েছিল কি না এবং বার্ষিক প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল কি না। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথি, চুক্তিপত্র ও করসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করলে অর্থপ্রদানের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। স্বাধীন তদন্ত হলে অভিযোগের সত্যতা ও প্রাসঙ্গিক বিধিবিধান মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
১৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ঘোষিত পারিশ্রমিকের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার তথ্য প্রকাশ না করার অভিযোগটি বাস্তব সংবাদভিত্তিক। তবে তাঁকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত বা অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার মতো সিদ্ধান্ত এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। ফিফার বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি এবং স্বাধীন যাচাইয়ের ফলাফলই এ বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।





