কেন-সাকার জোড়া গোলে ক্রোয়েশিয়াকে ৭-০তে উড়িয়ে ইংল্যান্ডের দুর্দান্ত গোলবন্যা
কেন সাকার জোড়া গোলে ইংল্যান্ড আজ ক্রোয়েশিয়াকে সাত গোলের ব্যবধানে হারিয়ে নেশনস লিগে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, বেলিংহামও ছিলেন দুর্দান্ত।
কেন-সাকার জোড়া গোলে ক্রোয়েশিয়াকে ৭-০তে উড়িয়ে ইংল্যান্ডের দুর্দান্ত গোলবন্যা
ইংল্যান্ডের জন্য শনিবারের রাতটি হয়ে থাকল স্মরণীয়। উয়েফা নেশনস লিগের তৃতীয় ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার মাঠে স্বাগতিকদের ৭-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে ইংল্যান্ড। ম্যাচজুড়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল, দ্রুত পাস, শক্তিশালী চাপ এবং দুর্দান্ত গোল করার দক্ষতায় ক্রোয়েশিয়াকে কার্যত অসহায় করে ফেলে ইংলিশরা। অধিনায়ক হ্যারি কেন ও বুকায়ো সাকা দুজনেই দুটি করে গোল করেন। জুড বেলিংহাম, অ্যান্থনি গর্ডন ও বদলি খেলোয়াড় মরগান রজার্স একটি করে গোল করে ইংল্যান্ডের বড় জয় নিশ্চিত করেন।
৩ অক্টোবর শনিবার ক্রোয়েশিয়ার রিয়েকার স্টাদিওন হেঙ্কে রিয়েকা স্টেডিয়ামে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই ইংল্যান্ড ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ম্যাচের মাত্র অষ্টম মিনিটেই গোল করে দলকে এগিয়ে দেন কেন। জুড বেলিংহামের কাছ থেকে বল পেয়ে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণের পর নিখুঁত শটে ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচকে পরাস্ত করেন তিনি।
এরপর ইংল্যান্ডের আক্রমণ আরও তীব্র হয়। ২১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন বেলিংহাম। অ্যান্থনি গর্ডনের তৈরি সুযোগ কাজে লাগিয়ে কাছ থেকে বল জালে পাঠান তিনি। ইংল্যান্ড তখন ক্রমেই ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে। স্বাগতিক দল বল ধরে রাখলেও ইংল্যান্ডের দ্রুত আক্রমণ সামলাতে পারছিল না।
৩৯ মিনিটে তৃতীয় গোলটি আসে গর্ডনের কাছ থেকে। ডান দিক থেকে জারেল কোয়ানসার বল বাড়িয়ে দিলে গর্ডন মাথা দিয়ে সেটি জালে পাঠান। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ইংল্যান্ড আবার গোল করে। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে সাকা গোল করে ইংল্যান্ডকে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। ফলে বিরতির আগেই ম্যাচের ফল প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধেও ইংল্যান্ডের আক্রমণে কোনো ভাটা পড়েনি। বরং ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ৫৩ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন কেন। ডান দিক থেকে এলিয়ট অ্যান্ডারসনের বাড়ানো বলের দিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কাছ থেকে বল জালে পাঠান ইংল্যান্ড অধিনায়ক। এতে ইংল্যান্ডের ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-০।
এরপর ৬৮ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন সাকা। ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ বল পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হলে সুযোগ পান কেন। তিনি বল বাড়িয়ে দেন সাকার দিকে। সাকা কাছ থেকে নিখুঁত শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন। ইংল্যান্ড তখন ৬-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। ম্যাচের শেষদিকে ৮৭ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা মরগান রজার্স সপ্তম গোল করে ক্রোয়েশিয়ার জন্য রাতটিকে আরও কঠিন করে দেন।
এই জয়ের মাধ্যমে ইংল্যান্ড নেশনস লিগের গ্রুপ এ-৩-এ তিন ম্যাচ শেষে ছয় পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে। একই গ্রুপে রয়েছে স্পেন ও চেকিয়া। গ্রুপের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম ও দ্বিতীয় দল সরাসরি পরবর্তী পর্বের কোয়ার্টার ফাইনালে যাবে। তাই এই বড় জয় ইংল্যান্ডের পরবর্তী পর্বে যাওয়ার অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে।
ম্যাচটির আরেকটি বড় বিষয় ছিল হ্যারি কেনের ব্যক্তিগত রেকর্ড। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দুটি গোল করে ইংল্যান্ডের হয়ে তার আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯। ১২৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে এই গোলসংখ্যা তাকে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় আরও অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। একই ম্যাচে তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তার সামনে এখন পিটার শিলটনের ১২৫ ম্যাচের রেকর্ড।
কেনের সামনে এখন আরও একটি বড় মাইলফলক। পরবর্তী ম্যাচে মাঠে নামলেই তিনি শিলটনের ১২৫ ম্যাচের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। এরপর নভেম্বর মাসে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ঘরের মাঠের ম্যাচে নতুন রেকর্ড গড়ার সুযোগ থাকবে তার।
এই ম্যাচে জুড বেলিংহামের পারফরম্যান্সও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তিনি একটি গোল করার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের আরও তিনটি গোল তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে কেনের প্রথম গোলের সময় তার বল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এবং আক্রমণ তৈরিতে তার গতি ইংল্যান্ডকে শুরুতেই এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। শেষ গোলটির সময়ও বেলিংহাম রজার্সকে বল বাড়িয়ে দেন।
ইংল্যান্ডের তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যেও এই ম্যাচে নজর কেড়েছেন অ্যালেক্স স্কট ও এলিয়ট অ্যান্ডারসন। স্কট নিজের প্রথম পূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নেমে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলেছেন। অ্যান্ডারসনও মাঝমাঠে বল দখল, দ্রুত আক্রমণ এবং সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গে তরুণদের এই সমন্বয় দলটির আক্রমণকে আরও কার্যকর করে তোলে।
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার জন্য ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত হতাশার। ঘরের মাঠে সাত গোল হজম করে তারা আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের মুখে পড়েছে বলে ম্যাচ-পরবর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের সবচেয়ে বড় হার ছিল ২০০৯ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ওয়েম্বলিতে ১-৫। এবার সেই ব্যবধান আরও ছাড়িয়ে গেল।
ক্রোয়েশিয়ার একাদশে ৪১ বছর বয়সী লুকা মদরিচও ছিলেন। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বহু বড় ম্যাচ খেললেও শনিবার ইংল্যান্ডের দ্রুত আক্রমণ ও ধারাবাহিক চাপ সামলাতে ক্রোয়েশিয়ার পুরো দলই সমস্যায় পড়ে। প্রথমার্ধেই চার গোল হজম করার পর দ্বিতীয়ার্ধে আরও তিন গোল খেয়ে ম্যাচ শেষ করে তারা।
ম্যাচটি দর্শকসংখ্যার দিক থেকেও ছিল ব্যতিক্রমী। উয়েফার শাস্তির কারণে ক্রোয়েশিয়ার জন্য ম্যাচটি মূলত সাধারণ দর্শকদের জন্য বন্ধ থাকার কথা ছিল। তবে স্থানীয় শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ফলে রিয়েকার গ্যালারিতে প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের স্বাভাবিক উপস্থিতি না থাকলেও শিশুদের উপস্থিতিতে ম্যাচের পরিবেশ ছিল আলাদা।
ফ্যাক্ট যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, দেওয়া মূল তথ্যটি সঠিক। ইংল্যান্ড সত্যিই ক্রোয়েশিয়াকে ৭-০ গোলে হারিয়েছে এবং হ্যারি কেন ও বুকায়ো সাকা দুজনেই দুটি করে গোল করেছেন। তবে ম্যাচটি শুধু এই দুই খেলোয়াড়ের গোলেই নির্ধারিত হয়নি। জুড বেলিংহাম একটি গোল করেছেন, অ্যান্থনি গর্ডন একটি গোল করেছেন এবং মরগান রজার্স শেষ গোলটি করেছেন। ফলে ইংল্যান্ডের সাতটি গোল এসেছে পাঁচজন খেলোয়াড়ের কাছ থেকে।
এই জয়ের পর ইংল্যান্ডের আত্মবিশ্বাস নিঃসন্দেহে বাড়ার মতো একটি ফল পেয়েছে। তবে গ্রুপের চূড়ান্ত অবস্থান এখনই নিশ্চিত হয়নি। স্পেনও একই গ্রুপে ছয় পয়েন্ট নিয়ে রয়েছে এবং তাদের একটি ম্যাচ হাতে ছিল। তাই পরবর্তী ম্যাচগুলোর ফলই নির্ধারণ করবে গ্রুপের শেষ অবস্থান ও কোয়ার্টার ফাইনালের পথ।
ইংল্যান্ডের পরবর্তী ম্যাচ ৬ অক্টোবর চেকিয়ার বিপক্ষে। এরপর ১২ নভেম্বর ঘরের মাঠে আবার ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হবে তারা। ১৫ নভেম্বর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে খেলবে ইংল্যান্ড। ফলে শনিবারের ৭-০ জয়ের পর সামনে রয়েছে আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, যেগুলো গ্রুপের চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সার্বিকভাবে রিয়েকার এই ম্যাচে ইংল্যান্ড দেখিয়েছে কীভাবে দ্রুত আক্রমণ, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর চাপ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা একসঙ্গে বড় ব্যবধান তৈরি করতে পারে। কেন ও সাকার জোড়া গোল, বেলিংহামের সৃজনশীলতা এবং গর্ডন ও রজার্সের গোল মিলিয়ে ৭-০ ব্যবধানের এই জয় ইংল্যান্ডের নেশনস লিগ অভিযানে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকল।