যুক্তরাষ্ট্রে কর জালিয়াতির অভিযানে ৭৬ জনের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের অভিযোগ
৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে কর জালিয়াতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের কথিত কর জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, দেশজুড়ে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ৭৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে অথবা তাঁদের চলমান মামলায় দোষ স্বীকার, দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও সাজা ঘোষণার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জর্জিয়ায় তিন মেক্সিকান নাগরিকের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের কর ফেরত জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযুক্ত হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগ এবং ওই বিভাগের অপরাধ তদন্ত শাখা যৌথভাবে এ অভিযানের তথ্য প্রকাশ করেছে। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত এই বিশেষ কার্যক্রমে দেশটির ৩৫টি ফেডারেল কৌঁসুলি কার্যালয় অংশ নেয়। কর ফাঁকি, ভুয়া কর বিবরণী দাখিল, বেআইনিভাবে কর ফেরত নেওয়া এবং এ ধরনের আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল অভিযানের লক্ষ্য।
কর্মকর্তাদের হিসাবে, অভিযানে ৭৬ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগে সরকারকে সম্ভাব্য কর রাজস্ব হারানোর পরিমাণ ৪৯ কোটি ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে নতুন অভিযোগের পাশাপাশি আগের মামলায় বিচার, দোষ স্বীকার ও সাজা ঘোষণার ঘটনাও রয়েছে। তাই পুরো অর্থকে ইতিমধ্যে প্রমাণিত চুরি কিংবা সরকারের কাছ থেকে উদ্ধার করা অর্থ হিসেবে দেখানো সঠিক হবে না।
মার্কিন কর্মকর্তারা এই উদ্যোগকে দেশজুড়ে সমন্বিত কর জালিয়াতিবিরোধী অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের অপরাধের কারণে সরকারি কোষাগারের পাশাপাশি সাধারণ করদাতার স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে অপরাধের তদন্ত, অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ উদ্ধার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই অভিযানের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে। সেখানে তিন মেক্সিকান নাগরিকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের কাছ থেকে ভুয়া কর ফেরত নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন গুস্তাভো রোহানো সালাজার, গ্যাব্রিয়েল রোহানো সালাজার এবং আন্দ্রেস হুয়ের্তা রেনদন। সরকারি নথি অনুযায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে ডাকযোগে ও বৈদ্যুতিক যোগাযোগের মাধ্যমে জালিয়াতির ষড়যন্ত্র, ডাক জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে অর্থের উৎস গোপন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে।
কৌঁসুলিদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই তিন ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিদের নামে থাকা মেক্সিকান পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছিলেন। সেসব পরিচয়পত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের কাছ থেকে স্বতন্ত্র করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নম্বর এমন ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহৃত হয়, যাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর বিবরণী জমা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু যাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর নেই বা পাওয়ার যোগ্যতা নেই।
সরকারি অভিযোগে বলা হয়েছে, শনাক্তকরণ নম্বর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ভুয়া কর বিবরণী তৈরি করে জমা দেওয়া হয়। এসব বিবরণীর ভিত্তিতে কর ফেরতের অর্থ দাবি করা হয়। পরে ফেরতের চেকগুলো অভিযুক্তদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ডাকঘরের বাক্সে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর তাঁরা চেকগুলো সংগ্রহ করে নগদায়নের মাধ্যমে অর্থ হাতে নিতেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
এই পদ্ধতিতে অভিযুক্ত তিন ব্যক্তি এবং তাঁদের সঙ্গে যুক্ত অন্যরা মোট ১৬ হাজারের বেশি মার্কিন সরকারি কর ফেরতের চেক নগদায়ন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। চেকগুলোর মোট মূল্য ৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য কত হবে, তা নির্ভর করবে হিসাবের সময়কার ডলারের বিনিময় হারের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই মামলায় অভিযুক্ত তিনজনকে ১৪ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন তাঁদের আদালতে হাজির করা হয় এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে তাঁদের হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য সরকারি বিবৃতিতে দেওয়া হয়নি। ফলে বিচার শেষ হওয়ার আগে তাঁদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সঠিক হবে না। মামলাটিতে আরও অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত দুই ভাই গুস্তাভো ও গ্যাব্রিয়েল রোহানো সালাজার অভিবাসনসংক্রান্ত আবেদনপত্রে অতীতে কোনো অপরাধ না করার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। এ অভিযোগের সঙ্গে কর ফেরত জালিয়াতির অভিযোগও যুক্ত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে আদালত।
দেশজুড়ে অভিযানের আরেকটি বড় ঘটনা টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে। সেখানে চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে ভুয়া আস্থাভিত্তিক আর্থিক কাঠামো ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। কৌঁসুলিদের দাবি, ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৫০ কোটি ডলারের বেশি আয় আড়াল করা হয়েছিল এবং এতে সরকারের সম্ভাব্য কর রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি ডলারের বেশি। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা ও তাঁদের দায় আদালতে নির্ধারিত হবে।
অভিযানের আওতায় শুধু ভুয়া কর ফেরতের ঘটনাই ছিল না। কর্মীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া কর সরকারকে জমা না দেওয়া, কর বিবরণী জমা না দেওয়া এবং আয় গোপন করার মতো অভিযোগেও বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিউ জার্সির একটি কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রায় ৪৯ লাখ ডলারের কর্মসংস্থানসংক্রান্ত কর পরিশোধ না করার অভিযোগও সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, তদন্তকারীরা একাধিক ধরনের কর অপরাধকে একই অভিযানের আওতায় এনেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ উদ্ধার করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অর্থ খরচ করে ফেললে তা উদ্ধার করা কঠিন হতে পারে। অর্থ দিয়ে কেনা সম্পত্তি, বিলাসবহুল গাড়ি এবং অন্যান্য সম্পদ শনাক্ত করে জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ জন্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও অর্থ উদ্ধারের কাজে বিশেষ দল গঠনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে অভিযানের আওতায় মোট কত অর্থ ইতিমধ্যে উদ্ধার হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ বলেছেন, কর জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা প্রতিটি ডলার শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণের অর্থের ক্ষতি করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অভিযানে যেসব ঘটনা সামনে এসেছে, সেগুলো আরও বিস্তৃত সমস্যার একটি অংশ হতে পারে। বিচার বিভাগ ভবিষ্যতেও এ ধরনের অপরাধের তদন্ত ও বিচারের কার্যক্রম জোরদার করতে চায়।
তবে এই অভিযান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বক্তব্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে তিন অভিযুক্তের মেক্সিকান নাগরিকত্বের তথ্য থেকে সব বিদেশি নাগরিক কর জালিয়াতি করেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো ভিত্তি নেই। সরকারি বিবৃতিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগের কথা বলা হয়েছে; সব বিদেশি নাগরিক বা কোনো একটি জাতীয়তার মানুষকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
একইভাবে, প্রায় ৫০ কোটি ডলারের অঙ্কটিও সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। এটি অভিযানের আওতায় থাকা মামলাগুলোতে কথিত ও প্রমাণিত অপরাধের কারণে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির সম্মিলিত হিসাব। এর অর্থ এই নয় যে ৭৬ জনই একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত, প্রত্যেকেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, কিংবা পুরো অর্থ ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে।