নিউইয়র্কের গভর্নর নির্বাচন সামনে রেখে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও বর্তমান গভর্নর ক্যাথি হোচুল এবং রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। নির্বাচনী বিতর্কের মঞ্চে নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানিকে ইহুদিবিদ্বেষী, খ্রিষ্টানবিরোধী এবং মার্কিন মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন না—এমন ব্যক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ব্লেকম্যান। একই সঙ্গে মামদানির সঙ্গে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কারণে হোচুলকেও আক্রমণ করেছেন তিনি। গত মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গভর্নর পদপ্রার্থীদের একমাত্র নির্ধারিত সরাসরি বিতর্কে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরদিন বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হোচুল ব্লেকম্যানের অভিযোগকে ‘অবাস্তব যুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, এমন বক্তব্যের জবাব দিয়ে তিনি সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে চান না। নিউইয়র্কের গভর্নর নির্বাচন ঘিরে অভিবাসন, অপরাধ, কর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি নিয়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র মতবিরোধের মধ্যেই মামদানিকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। বিতর্কের কেন্দ্রে মামদানি ও হোচুলের রাজনৈতিক সম্পর্ক
বিতর্কের শেষভাগে নিউইয়র্ক নগরের মেয়র মামদানির প্রসঙ্গ তোলেন ব্লেকম্যান। তাঁর অভিযোগ, হোচুল এমন একজন নেতার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণা করছেন, যিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ও মার্কিন সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধের বিরোধী। মামদানির সামষ্টিকতাবাদী রাজনৈতিক চিন্তাধারার সমালোচনা করে ব্লেকম্যান দাবি করেন, নগরের মেয়র ইহুদিবিদ্বেষী এবং খ্রিষ্টানদের প্রতিও বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। ব্লেকম্যানের অভিযোগের মধ্যে মামদানির একটি নির্বাহী আদেশের বিষয়ও উঠে আসে। তাঁর দাবি, ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞা দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই মামদানি ওই আদেশ জারি করেছেন। তবে এটি ব্লেকম্যানের রাজনৈতিক বক্তব্য ও ব্যাখ্যা; অভিযোগটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার মতো প্রমাণ এই প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। মামদানির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং তাঁর প্রকৃত নীতি ও বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। বিতর্কে হোচুল সরাসরি মামদানির পক্ষে বক্তব্য না দিয়ে নিউইয়র্ক নগর পুলিশের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানান। পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশের নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, নগর পুলিশ সহিংসতা বা ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পরিস্থিতিতে নিষ্ক্রিয় থাকবে—এমন ইঙ্গিত দেওয়া পুলিশ সদস্যদের জন্য অপমানজনক। এর মাধ্যমে হোচুল মূল অভিযোগের জবাব না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার ওপর জোর দেন।
পরদিন বুধবার সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করেন, বিতর্কের মঞ্চে তিনি কেন মামদানিকে সরাসরি সমর্থন করেননি। জবাবে হোচুল বলেন, প্রতিপক্ষের এমন অযৌক্তিক বক্তব্যের ফাঁদে তিনি পা দিতে চান না। তাঁর এই প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে হোচুলের বক্তব্য থেকে মামদানির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত—কোনোটিই বলা যায় না।
নিউইয়র্কের রাজনীতিতে মামদানির গুরুত্ব মামদানিকে ঘিরে এই বিতর্ককে কেবল দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত বাক্যবিনিময় হিসেবে দেখলে নির্বাচনের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষিত হবে। নিউইয়র্ক নগরের মেয়র হিসেবে মামদানি এখন অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। তাঁর সঙ্গে হোচুলের রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং নির্বাচনী প্রচারণায় সম্ভাব্য সহযোগিতা গভর্নর নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। ব্লেকম্যানের কৌশল হলো মামদানির সঙ্গে হোচুলের সম্পর্ককে সামনে এনে বর্তমান গভর্নরের রাজনৈতিক বিচারবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এর মাধ্যমে তিনি শুধু মামদানির সমালোচনা করছেন না, বরং হোচুলের সমর্থক ও মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যেও সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে হোচুলের কৌশল হলো ব্লেকম্যানকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো এবং তাঁর নীতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভোটারদের সতর্ক করা। ১৩ অক্টোবরের বিতর্কে দুই প্রার্থীর মধ্যে অভিবাসন, অপরাধ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিদ্যুতের বিল নিয়েও তীব্র মতবিরোধ হয়। হোচুল অভিযোগ করেন, ব্লেকম্যান অভিবাসন কর্মকর্তাদের কঠোর অভিযানকে সমর্থন করে অঙ্গরাজ্যের মানুষের জন্য সমস্যা তৈরি করছেন। অন্যদিকে ব্লেকম্যান দাবি করেন, হোচুলের অভিবাসননীতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল করেছে। বিদ্যুতের দাম ও কর নিয়েও দুই পক্ষ পরস্পরকে দায়ী করে। ব্লেকম্যান অঙ্গরাজ্যে উচ্চ কর এবং বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যয়ের জন্য হোচুলের প্রশাসনকে দায়ী করেন। হোচুল আবার এসব অর্থনৈতিক সমস্যার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও অন্যান্য জাতীয় নীতির প্রভাব তুলে ধরেন। ফলে নির্বাচনী লড়াইয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধ—দুই বিষয়ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জরিপে এগিয়ে হোচুল, তবে ব্যবধান নিয়ে বিতর্ক নির্বাচনী প্রতিযোগিতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে দাবি করা হচ্ছে, ব্লেকম্যানের সঙ্গে হোচুলের ব্যবধান এক অঙ্কে নেমে এসেছে। এই দাবির পেছনে কিছু জরিপের তথ্য রয়েছে। তবে সর্বশেষ পাওয়া জরিপের ফলাফল দেখায়, ব্যবধানটি সব জরিপে এক অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। সিয়েনা কলেজের সেপ্টেম্বরের জরিপে হোচুলের সমর্থন ছিল ৫০ শতাংশ এবং ব্লেকম্যানের ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল ৯ শতাংশ পয়েন্ট। এই ফলাফল থেকেই ব্লেকম্যান ব্যবধান কমিয়ে এনেছেন—এমন বক্তব্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু অক্টোবরের ১ থেকে ৪ তারিখে পরিচালিত মারিস্ট জরিপে ১ হাজার ৩৬১ জন নিবন্ধিত ভোটারের মতামত নেওয়া হয়। সেখানে হোচুলের সমর্থন ছিল ৫৩ শতাংশ এবং ব্লেকম্যানের ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান দাঁড়ায় ১১ শতাংশ পয়েন্ট। জরিপটির ত্রুটিসীমা ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট। এ কারণে ব্লেকম্যান ব্যবধান কমিয়েছেন—এমন দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। কিন্তু তিনি বর্তমানে এক অঙ্কের ব্যবধানে রয়েছেন, এমন বক্তব্যকে সর্বশেষ জরিপের নিশ্চিত চিত্র বলা যাবে না। ভোটারদের মতামত সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, আবার জরিপের পদ্ধতি ও নমুনার পার্থক্যেও ফলাফল আলাদা হতে পারে। নিউইয়র্ক ঐতিহাসিকভাবে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও রাজ্যের সব অঞ্চলের ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দ এক নয়। মারিস্ট জরিপে দেখা গেছে, নিউইয়র্ক নগরে হোচুলের সমর্থন ৬৯ শতাংশ। অন্যদিকে রাজ্যের উত্তরাঞ্চল ও নগরকেন্দ্রের বাইরের এলাকায় ব্লেকম্যানের সমর্থন তুলনামূলক শক্তিশালী। এই আঞ্চলিক পার্থক্য নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
রাজনৈতিক বিতর্কের প্রভাব কতটা পড়বে মামদানিকে ঘিরে ব্লেকম্যানের আক্রমণ তাঁর নিজস্ব সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। বিশেষ করে যেসব ভোটার ইহুদিবিদ্বেষ, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ও আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেন, তাঁদের কাছে এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে অভিযোগের ভাষা যত কঠোরই হোক, ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রমাণের ওপর।
অন্যদিকে হোচুলের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, তিনি যেন বিতর্কের উত্তাপের মধ্যেও নিজের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক নীতি এবং জননিরাপত্তা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরতে পারেন। শুধু প্রতিপক্ষকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরা যথেষ্ট হবে কি না, তা নির্ভর করবে ভোটারদের বাস্তব উদ্বেগের প্রতি তাঁর জবাবের ওপর। মামদানির ক্ষেত্রেও এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ। একজন নগরপ্রধান হিসেবে তাঁর নীতি, বক্তব্য এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেগুলোর জবাব তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগকে যাচাই ছাড়া সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব উপেক্ষা করাও সঠিক হবে না।