ব্রেকিং
মামদানিকে ইহুদিবিদ্বেষী বললেন ব্লেকম্যান, হোচুলকে ঘিরে নিউইয়র্কে বিতর্কযুক্তরাষ্ট্রে কর ফরমে নাগরিকত্বের তথ্য চাওয়ার প্রস্তাব, অভিবাসী পরিবারে নতুন উদ্বেগ বাড়ছেএইচ-১বি ভিসায় নতুন নিয়ম, বিদেশি কর্মী নিয়োগে বাড়তে পারে কোম্পানির খরচযুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গ্রিনকার্ড প্রক্রিয়ায় বাধা, বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদেরও জরুরি সতর্কতা জানুনমহানবীকে অবমাননার অভিযোগে ইরানে ২৩ বছর বয়সী নাজমেহ আমিনির মৃত্যুদণ্ডের রায়ে চাঞ্চল্য

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে ঢাকার রিকশাচিত্র, শিল্পীদের নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করবে ইউনেস্কো

ইউনেস্কো ও উইন্ডমিল অ্যাডভার্টাইজিংয়ের নতুন উদ্যোগে বিশ্বদরবারে পরিচিতি বাড়বে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্রের, প্রশিক্ষণ ও নতুন বাজারের সুযোগ পাবেন শিল্পীরা।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে ঢাকার রিকশাচিত্র, শিল্পীদের নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করবে ইউনেস্কো
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে ঢাকার রিকশাচিত্র, শিল্পীদের নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করবে ইউনেস্কো

ঢাকার রিকশার রঙিন ছবি, ফুল-লতাপাতা, পাখি, বাঘ, গ্রামীণ প্রকৃতি ও নানা লোকজ উপাদানে আঁকা চিত্রকর্ম এবার বিশ্বজুড়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্রের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত চিত্রশিল্পীদের জীবিকা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে যৌথভাবে কাজ করবে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো এবং দেশীয় বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান উইন্ডমিল অ্যাডভার্টাইজিং লিমিটেড।

এ লক্ষ্যে গত ৭ অক্টোবর ঢাকায় ইউনেস্কোর কার্যালয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় ‘রিকশাচিত্র: ক্যানভাসের বিস্তার’ শীর্ষক একটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রদর্শনী, প্রচার, নতুন বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি রিকশাচিত্রের ইতিহাস, নান্দনিক বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সংরক্ষণ এবং শিল্পীদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

৭ অক্টোবর প্রকাশিত ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনেও এই সমঝোতার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উদ্যোগটির অন্যতম লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের এই স্বতন্ত্র লোকশিল্পকে আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শিল্পীদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করা।

সমঝোতা স্মারকে ইউনেস্কোর পক্ষে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রতিনিধি ও ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান সুসান ভিজে। অন্যদিকে উইন্ডমিল অ্যাডভার্টাইজিং লিমিটেডের পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কৌশলগত পরিকল্পনাবিদ শুমন পাটোয়ারী। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর সংস্কৃতিবিষয়ক বিভাগের প্রধান কিজি তাহনিন, কর্মসূচি সহকারী বিপাশা ত্রিপুরা এবং উইন্ডমিলের পরিচালনা ও গ্রাহকসেবা বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. মতিউর রহমান রব্বি উপস্থিত ছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুসান ভিজে বলেন, রিকশাচিত্র এমন একটি জীবন্ত ঐতিহ্য, যা শিল্পীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে টিকে আছে। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে শিল্পীরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অংশীদারত্বের মাধ্যমে তাঁদের জীবিকা সহায়তা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের দক্ষতা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উইন্ডমিল অ্যাডভার্টাইজিংয়ের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সৃজনশীল যোগাযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির মাধ্যমে রিকশাচিত্রকে আরও বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রচার, জনসচেতনতা সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের অভিজ্ঞতা এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজে লাগানো হবে।

উদ্যোগটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রিকশাচিত্রকে শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয় হিসেবে না দেখে শিল্পীদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা। প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্পীরা তাঁদের কাজের মান ও উপস্থাপনা আরও উন্নত করার সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে প্রদর্শনী, প্রচার কার্যক্রম এবং বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলে তাঁদের শিল্পকর্মের পরিচিতি বাড়তে পারে।

তবে শিল্পীদের আয় কতটা বাড়বে, কতজন প্রশিক্ষণ পাবেন, কতটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে কিংবা নতুন বাজারে তাঁদের কাজ বিক্রির ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠবে—এসব বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সময়সীমা জানানো হয়নি। ফলে উদ্যোগটির সম্ভাব্য সুফল সম্পর্কে আশাবাদ থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশের রিকশাচিত্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ইতিহাসেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। ২০২৩ সালে ‘ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র’ মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণে ইউনেস্কোর প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ইউনেস্কোর আনুষ্ঠানিক নথি অনুযায়ী, এই স্বীকৃতি শুধু রিকশার বাহ্যিক সাজসজ্জার জন্য নয়; বরং রিকশা নির্মাণ, চিত্রাঙ্কন, কারিগরি দক্ষতা, শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং নগরজীবনের সঙ্গে এই ঐতিহ্যের সম্পর্কের স্বীকৃতিও বহন করে।

রিকশাচিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর উজ্জ্বল রং, সহজবোধ্য উপস্থাপনা এবং পরিচিত জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তু। ফুল, পাতা, পাখি, বাঘ, ঘোড়া, নদী, গ্রামীণ দৃশ্য, ঐতিহাসিক ঘটনা, লোককাহিনি, জাতীয় ব্যক্তিত্ব ও চলচ্চিত্রের তারকার ছবি বিভিন্ন রিকশার পেছনে কিংবা অন্যান্য অংশে দেখা যায়। কোথাও থাকে অলংকারধর্মী নকশা, কোথাও আবার একটি ছবির মধ্যে ফুটে ওঠে গল্প বা সামাজিক বার্তা। এসব চিত্রকর্মের কারণে চলমান রিকশাও যেন নগরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো একেকটি ছোট প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।

ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবিষয়ক নথিতে বলা হয়েছে, রিকশা নির্মাণ ও সাজানোর কাজে কারিগরদের দলগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে চিত্রশিল্পীরা সাধারণত কাজের заказ বা নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী ছবি আঁকেন এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছে নিজেদের দক্ষতা হস্তান্তর করেন। হাতে-কলমে শেখা, দীর্ঘদিনের অনুশীলন এবং অভিজ্ঞ শিল্পীদের কাছ থেকে কাজ শেখার মাধ্যমে এই শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এখন উদ্যোগটির অন্যতম লক্ষ্য। কারণ, কোনো ঐতিহ্যকে কেবল তালিকাভুক্ত করা বা প্রদর্শনীর মাধ্যমে পরিচিত করে তোলাই যথেষ্ট নয়। সেই ঐতিহ্য যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের কাজের পরিবেশ, আয়, সামাজিক মর্যাদা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে শেখানোর সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। শিল্পীরা যদি তাঁদের কাজের ন্যায্য মূল্য না পান কিংবা নতুন প্রজন্মের কাছে এই পেশা আকর্ষণীয় না থাকে, তাহলে ঐতিহ্যটির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

এখানেই ‘রিকশাচিত্র: ক্যানভাসের বিস্তার’ উদ্যোগটির সম্ভাবনা। রিকশার কাঠামোতে আঁকা ছবির বাইরেও এই শিল্পের নকশা ও চিত্রভাষাকে প্রদর্শনী, সৃজনশীল প্রচার এবং বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্যে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পীদের যোগাযোগ বাড়লে তাঁদের কাজের নতুন ব্যবহার ও বিপণনের পথও উন্মুক্ত হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে শিল্পীদের অংশগ্রহণ, পারিশ্রমিক, স্বত্বের সুরক্ষা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হয় তার ওপর।

রিকশাচিত্রের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে শিল্পীদের স্বার্থ রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের নকশা ও সৃজনশীল কাজ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যথাযথ স্বীকৃতি, সম্মতিভিত্তিক ব্যবহার এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঐতিহ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে নতুন ধরনের উপস্থাপনা তৈরি করা গেলে শিল্পীরা যেমন লাভবান হতে পারেন, তেমনি আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও বাংলাদেশের লোকশিল্পের স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত বা নির্দিষ্ট গবেষণার উদ্ধৃতি ছাড়া এই অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ ফলাফল নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর শিল্পীদের দক্ষতা উন্নয়ন, নথিভুক্তকরণ, প্রদর্শনী এবং নতুন বাজারের সঙ্গে সংযোগের মতো কার্যক্রম একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর সফলতা নির্ধারিত হবে উদ্যোগটি কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং শিল্পীরা বাস্তবে কতটা সুবিধা পান তার ভিত্তিতে।


ট্যাগ: রিকশাচিত্রবাংলাদেশের ঐতিহ্যইউনেস্কোউইন্ডমিল অ্যাডভার্টাইজিংলোকশিল্পঢাকার রিকশাশিল্পীদের জীবিকাসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যশিল্পী প্রশিক্ষন

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।