অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালুর সুপারিশে আপত্তি, জবাবদিহি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্যামেরা ব্যবহারে ঘাটতি চিহ্নিত করেছে সরকারি নিরীক্ষা সংস্থা। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যামেরা চালুর সুপারিশে আপত্তি জানিয়েছে নিরাপত্তা বিভাগ।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কর্মকর্তাদের দেহে লাগানো ক্যামেরার ব্যবহার, তদারকি এবং জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি নিরীক্ষা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুটি প্রধান সংস্থার ক্যামেরা ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর করতে ক্যামেরা ব্যবহারের নিয়ম হালনাগাদ, কার্যকারিতা পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে ক্যামেরা চালু থাকা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করার সুপারিশ বাস্তবায়নে আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ।
১৪ অক্টোবর প্রকাশিত সরকারি জবাবদিহি দপ্তরের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা এবং শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থার দেহে লাগানো ক্যামেরা কর্মসূচি পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুটি সংস্থাই ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করার পর কর্মসূচি পরিচালনার পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। তবে ক্যামেরা বিতরণ, ব্যবহার এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও তাদের পরিকল্পনা যথাযথভাবে হালনাগাদ করা হয়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসূচি পরিচালনা এবং এর কার্যকারিতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়ে গেছে।
দেহে লাগানো ক্যামেরার প্রধান উদ্দেশ্য হলো সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের দৃশ্য ও শব্দ ধারণ করা। কোনো ব্যক্তিকে আটক, তল্লাশি কিংবা আইন প্রয়োগের সময় কী ঘটেছে, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে এসব রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে। কোনো ঘটনায় কর্মকর্তা বা সাধারণ মানুষের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা দিলে ধারণ করা ভিডিও তদন্তকারীদের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং সরকারি সংস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতেও ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু ক্যামেরা সরবরাহ করলেই যে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রেকর্ড হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকারি প্রতিবেদনে ক্যামেরা যথাযথভাবে চালু হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, নির্দিষ্ট কার্যক্রম শুরু হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যামেরা চালু করার প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এতে কোনো কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে ক্যামেরা চালু করতে ভুলে গেলে বা যথাসময়ে চালু না করলে সেই ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এই সুপারিশ নিয়ে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের আপত্তি রয়েছে। বিভাগের যুক্তি, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যামেরা চালু হলে এমন কিছু সংবেদনশীল কথোপকথন বা পরিস্থিতিও রেকর্ড হয়ে যেতে পারে, যেগুলো ধারণ করা অনুচিত। এর মধ্যে তথ্যদাতা বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে গোপনীয় যোগাযোগ এবং মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগকারী সাধারণ মানুষের দৃশ্য ধারণের ঝুঁকিও রয়েছে। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের স্বাভাবিক চলাফেরা বা দৈনন্দিন কাজের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্যামেরা চালু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই আপত্তির কারণে প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। সরকারি জবাবদিহি দপ্তর মনে করছে, ক্যামেরা ব্যবহারের নীতিমালা থাকলেও শুধু লিখিত নিয়মের ওপর নির্ভর করলে সব পরিস্থিতিতে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন। অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ থাকলে কর্মকর্তারা কখন ক্যামেরা চালু করবেন, সে বিষয়ে নিয়ম মানার নিশ্চয়তা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ মনে করছে, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষার নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ক্যামেরা কর্মসূচির কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য ও মূল্যায়নব্যবস্থা থাকা জরুরি। শুধু কতগুলো ক্যামেরা বিতরণ করা হয়েছে, তা দিয়ে কর্মসূচির সাফল্য নির্ধারণ করা যায় না। ক্যামেরা যথাযথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, প্রয়োজনীয় ঘটনার দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছে কি না এবং তদন্তে এসব রেকর্ড কতটা কাজে আসছে, সেসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিটি দপ্তরের কাজের ধরন অনুযায়ী ক্যামেরা ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থায় প্রায় চার হাজার আটশ ক্যামেরা এবং জুন পর্যন্ত শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থায় প্রায় এগারো হাজার পাঁচশ ক্যামেরা বিতরণ করা হয়েছিল। তবে ক্যামেরার সংখ্যা থাকাই যথেষ্ট নয়; সেগুলো কোথায়, কীভাবে এবং কতটা নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নিরীক্ষা দপ্তরের পর্যালোচনায় এ কারণেই কর্মসূচির পরিকল্পনা, পরিচালনা এবং তদারকি আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটির সাতটি সুপারিশের মধ্যে ছয়টিতে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ সম্মতি দিয়েছে। তবে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়া নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ চালুর সুপারিশে বিভাগটি সম্মত হয়নি। সরকারি জবাবদিহি দপ্তর অবশ্য মনে করছে, এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করা হলে অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্যামেরা ব্যবহারের নীতিমালা মেনে চলা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। ক্যামেরার রেকর্ড যেমন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে সহায়তা করতে পারে, তেমনি যথাযথ নিয়ম ছাড়া রেকর্ডিং ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই ক্যামেরা কখন চালু হবে, কোন পরিস্থিতিতে রেকর্ডিং সীমিত থাকবে এবং ধারণ করা দৃশ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও পর্যালোচনা করা হবে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্যামেরা কর্মসূচিতে তদারকি ও কার্যকারিতা মূল্যায়নের ঘাটতি সামনে এসেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যামেরা চালু করার প্রযুক্তি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও, ক্যামেরার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, নিয়মিত তদারকি করা এবং জনগণের আস্থা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। তবে এই সুপারিশের ফলে অবিলম্বে কোনো নতুন আইন কার্যকর হয়েছে বা ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালুর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।





