জেএফকে বিমানবন্দরে ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ, তীব্র নিন্দা জানালেন বিএনপির রুহুল কবির রিজভী
নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে বিক্ষোভের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বিএনপি, তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে বিক্ষোভ ও মৌখিক হেনস্তার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। বুধবার, ১৪ অক্টোবর, প্রকাশিত তাঁর বিবৃতিতে ঘটনাটিকে বাংলাদেশের মর্যাদার জন্য অসম্মানজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিকল্পিতভাবে ড. ইউনূসকে হেনস্তা করেছেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার, ১২ অক্টোবর, নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে একদল ব্যক্তি বিক্ষোভ করেন। স্থানীয় সময় বিকেল পৌনে চারটার দিকে তাঁর বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ঘটনাটি ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দৃশ্যচিত্রে দেখা যায়, হুইলচেয়ারে থাকা ড. ইউনূসের সামনে কয়েকজন ব্যক্তি জড়ো হয়ে উচ্চস্বরে নানা অভিযোগ ও স্লোগান দিচ্ছেন। পরে তাঁকে নিয়ে সঙ্গীরা বিমানবন্দরের ভেতরে ফিরে যান এবং নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে জনতার ভিড় থেকে সরিয়ে নেন।
প্রকাশিত দৃশ্যচিত্রে বিক্ষোভকারীদের ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলতে শোনা যায়। তাঁরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র, গ্রেপ্তার এবং পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর মতো বিষয় নিয়ে অভিযোগ তোলেন। তবে বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যে উত্থাপিত এসব অভিযোগের সত্যতা ওই দৃশ্যচিত্র থেকে প্রমাণিত হয় না। অভিযোগগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল ছাড়া সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
রুহুল কবির রিজভী তাঁর বিবৃতিতে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মতে, সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতেই সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে লক্ষ্য করে এ ধরনের আচরণ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুসারীরা দেশে-বিদেশে প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ড. ইউনূস কেবল বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টাই নন, তিনি নোবেল পুরস্কারজয়ী এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রতি বিদেশের মাটিতে অসম্মানজনক আচরণ করা হলে তা দেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শালীনতা, পারস্পরিক সম্মান এবং আইন মেনে চলার গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
তবে রিজভীর বিবৃতিতে বর্ণিত রাজনৈতিক দায় ও উদ্দেশ্যসংক্রান্ত বক্তব্য তাঁর দলীয় অবস্থান এবং অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। বিমানবন্দরের ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাঁরা কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।
ঘটনার পর বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকেও নিন্দা জানানো হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে হেনস্তার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলকে স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে এ ধরনের আচরণকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সমীচীন নয়।
ড. ইউনূসের সফরসঙ্গী লামিয়া মোরশেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে জানান, ঘটনার পর ড. ইউনূসের কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি এবং তিনি ভালো আছেন। তাঁর এই বক্তব্য ঘটনাটি নিয়ে ছড়িয়ে পড়া উদ্বেগের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে সামনে এসেছে। তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, ঘটনাটি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বিভাজন এবং বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও তার প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছে। দেশে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, প্রতিবাদ এবং বিরোধিতার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্য ব্যক্তিকে ঘিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, ভয় দেখানো কিংবা নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটানো গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পুরো গোষ্ঠীকে দায়ী না করে প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রিজভী তাঁর বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের অতীত শাসনামল নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগও উত্থাপন করেন। তিনি গুম, হত্যা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুসারীদের আচরণে পরিবর্তন আসেনি। তবে এসব বক্তব্যের প্রতিটি অভিযোগকে সংশ্লিষ্ট ঘটনা, নথি ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।
বিমানবন্দরের ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকলেও এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, নিরাপত্তাব্যবস্থার পর্যালোচনা এবং আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা অতীত দায়িত্বের কারণে তাঁর প্রতি অসম্মানজনক আচরণকে বৈধতা দেওয়া যায় না। আবার রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্তের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও উচিত নয়।
নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে বিক্ষোভের ঘটনাটি বাংলাদেশে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঘটনাটির তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে দেশের মর্যাদার জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। এখন তদন্তের অগ্রগতি, যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের অপেক্ষা।





