ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া শ্রমজীবীদের মন বদলাচ্ছে, ওহাইওতে বিপাকে রিপাবলিকানরা নির্বাচনের আগে
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ এবং ইরান সংঘাতের প্রভাব নিয়ে ওহাইওর কিছু শ্রমজীবী ভোটার নতুন করে ভাবছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ওহাইও অঙ্গরাজ্যে শ্রমজীবী ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখা রিপাবলিকান দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ২০১৬ ও ২০২৪ সালে ভোট দেওয়া কিছু মানুষ এবার নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি ও খাবারের দাম, কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের অধিকার এবং প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক বক্তব্য। ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই পরিবর্তনের চিত্র।
ওহাইও একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ছিল। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের উত্থানের সময় শ্রমজীবী ও শিল্পাঞ্চলের বহু ভোটার তাঁর প্রতি সমর্থন জানান। তাঁদের একটি অংশ মনে করেছিল, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি ও শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি তাঁদের কর্মসংস্থান এবং পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক হবে। পরবর্তী বছরগুলোতে রাজ্যটি রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এবার সেই সমর্থনের কিছু অংশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ওয়ারেন শহরের ৪৮ বছর বয়সী ইস্পাত পরিবহনকর্মী ও যাজক পল রিংগোল্ডের অভিজ্ঞতা এই অনিশ্চয়তার একটি উদাহরণ। তিনি ২০১৬ সালে ট্রাম্পকে, ২০২০ সালে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনকে এবং ২০২৪ সালে আবার ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার সিনেট, গভর্নর ও অন্যান্য নির্বাচনে কাকে সমর্থন করবেন, তা এখনো ঠিক করেননি। রয়টার্সকে তিনি জানান, জ্বালানি ও খাবারের বাড়তি দাম এবং ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বক্তব্য তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
এমন ভোটারদের সমর্থন ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেখছে ডেমোক্র্যাট দল। তবে সব শ্রমজীবী ভোটার যে রিপাবলিকানদের থেকে সরে যাচ্ছেন, এমন প্রমাণ নেই। কেউ কেউ এখনো ট্রাম্পের অভিবাসননীতি, রক্ষণশীল সামাজিক অবস্থান এবং ব্যক্তিগত অবসর সঞ্চয়ের মূল্যবৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
ওহাইওর নির্বাচনে সিনেট ও গভর্নর পদ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেরড ব্রাউন। অন্যদিকে গভর্নর পদে রিপাবলিকান বিবেক রামাস্বামীর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাকটন। এই প্রতিযোগিতার ফল কেবল রাজ্যের নেতৃত্বই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে ট্রাম্বুল কাউন্টির আগাম ভোটের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম তিন দিনে সেখানে ১ হাজার ২২৪ জন ডেমোক্র্যাট ভোটার ভোট দিয়েছেন, যেখানে রিপাবলিকান ভোটারের সংখ্যা ছিল ৫৫৯। রাজনৈতিক পরিচয় জানা যায়নি—এমন ভোটারদের সংখ্যা ছিল ৪৫৩। এই পরিসংখ্যান আগাম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের বেশি সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। তবে এটি পুরো অঙ্গরাজ্যের ভোটের চিত্র নয় এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল কী হবে, তা নিশ্চিত করে না।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারাও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া, কর্মক্ষেত্রে অধিকার রক্ষা এবং অন্যায্য শ্রমচর্চার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ বাধা তৈরি করেছে। তাঁরা মনে করছেন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের পাশাপাশি শ্রমজীবী পরিবারের বাস্তব আর্থিক সমস্যাগুলোকেও নির্বাচনী নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
শিল্পাঞ্চলের কর্মসংস্থানের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনও ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, ইয়ংস্টাউন-ওয়ারেন এলাকায় উৎপাদনশিল্পের চাকরি ১৯৯০ সালের প্রায় ৫০ হাজার থেকে কমে ২০২৬ সালে প্রায় ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। নতুন কিছু কারখানা গড়ে উঠলেও পুরোনো শিল্পের কর্মসংস্থান হারানো অনেক পরিবারের জন্য এখনো বড় সমস্যা।
অন্যদিকে রিপাবলিকান সমর্থকদের একটি অংশ বলছে, সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণশীল মূল্যবোধ তাদের কাছে জ্বালানির দামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থাকলেও ভোটাররা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দল পরিবর্তন করবেন, এমন ধারণা ঠিক নয়।
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের একাংশের জন্য ভোট হবে। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না, তার ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদের আইন প্রণয়ন ও বাজেট বাস্তবায়নের সুযোগ অনেকটাই নির্ভর করবে।
বাংলাদেশি-আমেরিকান পরিবারগুলোর জন্যও নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির দাম, খাবারের ব্যয়, চাকরি, শ্রমিক অধিকার এবং অভিবাসননীতি তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ওহাইওর কয়েকজন ভোটারের অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মতামত নির্ধারণ করা যাবে না।





