ব্রেকিং
অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালুর সুপারিশে আপত্তি, জবাবদিহি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কযুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৩.৭ শতাংশে, পেট্রলের দাম এক মাসে বেড়েছে ৯.১ শতাংশসাবেক সিআইএ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির মামলা স্থগিত, এক বছর পর অভিযোগ প্রত্যাহারের শর্তসাহায্য চাওয়ার ছলে প্রবীণদের গয়না চুরি, চার অঙ্গরাজ্যে অভিযুক্ত রোমানীয় দম্পতিজেএফকে বিমানবন্দরে ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ, তীব্র নিন্দা জানালেন বিএনপির রুহুল কবির রিজভী

বাংলাদেশের মেয়ে মাহমুদা সুলতানা, নাসার বিজ্ঞানী হয়ে বদলে দিচ্ছেন মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি, এরপর নাসায় বিজ্ঞানী হিসেবে সাফল্য। মাহমুদা সুলতানার উদ্ভাবন মহাকাশ গবেষণায় খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

বাংলাদেশের মেয়ে মাহমুদা সুলতানা, নাসার বিজ্ঞানী হয়ে বদলে দিচ্ছেন মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের মেয়ে মাহমুদা সুলতানা, নাসার বিজ্ঞানী হয়ে বদলে দিচ্ছেন মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা এক মেয়ে একসময় মনে করতেন, তাঁর চারপাশে নারী প্রকৌশলী না থাকায় হয়তো মেয়েদের পক্ষে এই পেশায় এগিয়ে যাওয়া কঠিন। অথচ সেই মেয়েই আজ যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একজন বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণায় উঠে আসছে এমন কিছু প্রযুক্তির ধারণা, যা ভবিষ্যতে মহাকাশযানকে আরও হালকা, কার্যকর ও তুলনামূলক কম ব্যয়ে পরিচালনার পথ খুলে দিতে পারে। তিনি মাহমুদা সুলতানা—বাংলাদেশি শিকড়ের একজন বিজ্ঞানী, যাঁর জীবনযাত্রা এবং উদ্ভাবনী কাজ নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

মাহমুদা সুলতানার শৈশব কেটেছে বাংলাদেশে। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ সিভিল প্রকৌশলী। বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণের কাজে যুক্ত থাকার কারণে তিনি পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণসহ নানা প্রকৌশলগত বিষয় নিয়ে কাজ করতেন। ছোটবেলায় মাহমুদাকে কাজের জায়গায় নিয়ে যেতেন তাঁর বাবা। বিভিন্ন যন্ত্র কীভাবে কাজ করে, নিয়ন্ত্রণকক্ষের ভেতরে কীভাবে বিভিন্ন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়—এসব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল তৈরি হয়।

তবে তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশে নারী প্রকৌশলীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিরল। প্রকৌশলীদের একটি আবাসিক এলাকায় বড় হওয়ার সময় আশপাশে অসংখ্য পুরুষ প্রকৌশলী দেখলেও কোনো নারী প্রকৌশলী তাঁর চোখে পড়েনি। ফলে অল্প বয়সে তাঁর মনে ধারণা তৈরি হয়েছিল, প্রকৌশল হয়তো মূলত পুরুষদের পেশা। পরবর্তী সময়ে নিজের জীবন দিয়েই সেই ধারণা ভেঙেছেন তিনি।

মহাকাশ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরিতেও পরিবারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এক নিকট আত্মীয় ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত নাসার অ্যামেস গবেষণাকেন্দ্রে পদার্থবিদ হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর কাছ থেকে মহাকাশ ও বিজ্ঞান নিয়ে নানা গল্প শুনে মাহমুদার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। নাসায় কাজ করার আকাঙ্ক্ষাও তখন থেকেই তাঁর মনে জায়গা করে নেয়।

১৪ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান মাহমুদা। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার নতুন পরিবেশে তিনি নিজের আগ্রহ ও দক্ষতাকে আরও বিকশিত করার সুযোগ পান। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে গণিতে অপ্রধান বিষয়সহ রাসায়নিক প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর বৃত্তি নিয়ে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ২০১০ সালে রাসায়নিক প্রকৌশলে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

নাসায় যোগ দেওয়ার গল্পটিও তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পিএইচডির শেষ বছরে চাকরির সন্ধানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন মাহমুদা। এমআইটির একটি কর্মসংস্থান মেলায় নিজের জীবনবৃত্তান্ত বিতরণ করতে করতে শেষ কপিটি হাতে ছিল তাঁর। তখন নাসার গডার্ড মহাকাশ উড়ানকেন্দ্রের বুথ তাঁর চোখে পড়ে। ছোটবেলার স্বপ্নের কথা মনে করে শেষ জীবনবৃত্তান্তটি তিনি সেখানে জমা দেন।

প্রথমে তাঁকে জানানো হয়েছিল, রাসায়নিক প্রকৌশলে পড়াশোনা করা প্রার্থীদের জন্য ওই বিভাগে সুযোগ সীমিত। কিন্তু নিজের গবেষণায় ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক যন্ত্র নিয়ে বহুমুখী কাজের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁর প্রতি আগ্রহী হন। পরবর্তী সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ২০১০ সালে নাসার গডার্ড মহাকাশ উড়ানকেন্দ্রে যোগ দেন তিনি। এভাবেই শৈশবের স্বপ্ন বাস্তবের পথে এগিয়ে যায়।

নাসায় যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই মাহমুদা গ্রাফিনভিত্তিক সেন্সর প্রযুক্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় যুক্ত হন। গ্রাফিন হলো কার্বন পরমাণুর এক স্তর দিয়ে তৈরি অত্যন্ত পাতলা একটি উপাদান। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে ভবিষ্যতের মহাকাশযানের জন্য হালকা, সংবেদনশীল ও কার্যকর যন্ত্র তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০১৭ সালে নাসার গডার্ডকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মসূচির বর্ষসেরা উদ্ভাবক পুরস্কার লাভ করেন। নাসার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কাজের মাধ্যমে উন্নত ক্ষুদ্র সেন্সর ও মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী বিভিন্ন যন্ত্র তৈরির সম্ভাবনা সামনে আসে। তাঁর গবেষণার কিছু প্রযুক্তির জন্য পেটেন্টের আবেদনও করা হয়েছিল।

তাঁর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্রের মাইক্রোশাটার অ্যারে। এই ব্যবস্থায় অসংখ্য ক্ষুদ্র দরজা নির্দিষ্টভাবে খুলতে ও বন্ধ হতে পারে, যার সাহায্যে নির্বাচিত আলোকসংকেত যন্ত্রের ভেতরে প্রবেশ করে। মহাকাশের দূরবর্তী বস্তু থেকে আসা আলো বিশ্লেষণের মতো জটিল গবেষণায় এ ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে তাঁর গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো কোয়ান্টাম ডট ব্যবহার করে আলো বিশ্লেষণের যন্ত্র তৈরি করা। কোয়ান্টাম ডট হলো অতি ক্ষুদ্র অর্ধপরিবাহী কণা, যাদের আকার ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলো শোষণ ও নির্গমনের আচরণ বদলে যায়। এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন যন্ত্র তৈরির চেষ্টা করছেন, যা আলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মহাকাশ গবেষণার যন্ত্রকে আরও ক্ষুদ্র ও হালকা করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

মাহমুদা সুলতানার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী গবেষণা ধারণাগুলোর একটি হলো ‘সায়েন্সক্রাফট ফর আউটার প্ল্যানেট এক্সপ্লোরেশন’, সংক্ষেপে স্কোপ। এই ধারণায় সৌরপালকে শুধু মহাকাশযানকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে তার গায়েই বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সৌরপালের ওপর কোয়ান্টাম ডটভিত্তিক আলোক বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সংযুক্ত করা গেলে একই কাঠামো দিয়ে মহাকাশযান পরিচালনা ও বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের কাজ করা সম্ভব হতে পারে।

নাসা ২০২২ সালে এই ধারণার প্রাথমিক গবেষণার জন্য সহায়তা দেয় এবং ২০২৪ সালে প্রকল্পটিকে দ্বিতীয় পর্যায়ের গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য নির্বাচন করে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য নেপচুন ও তার উপগ্রহ ট্রাইটনের মতো দূরবর্তী জগৎ অনুসন্ধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা। তবে এটি এখনো গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের পর্যায়ের একটি ধারণা; বাস্তবে এমন মহাকাশযান অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না।

নিজের গবেষণার পাশাপাশি তরুণদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করতেও কাজ করেন মাহমুদা। নাসাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, স্কুলের শিক্ষার্থীদের সামনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বক্তব্য দেন। তাঁর উদ্দেশ্য হলো, মেয়েরা যেন বুঝতে পারে যে বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন তাদের জন্যও সমানভাবে উন্মুক্ত।

বাল্টিমোরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের ঘটনাটি তাঁকে বিশেষভাবে আনন্দিত করেছিল। নাসার সাক্ষাৎকারে মাহমুদা জানান, মেয়েটির টি-শার্টে লেখা ছিল, রাজকন্যা নয়, সে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হতে চায়। মেয়েটি তাঁকে বলেছিল, বড় হয়ে তাঁর মতো হতে চায় এবং নাসায় কাজ করতে চায়। মাহমুদার কাছে ঘটনাটি ছিল নিজের অভিজ্ঞতা অন্য একটি শিশুর স্বপ্নকে প্রভাবিত করতে পারার এক স্মরণীয় মুহূর্ত।

তাঁর বাবা-মা শুরুতে চেয়েছিলেন, তিনি চিকিৎসক হন। কিন্তু নিজের আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মাহমুদা বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে আলাদা পথ তৈরি করেছেন। তাঁর কর্মজীবন দেখায়, প্রতিভা বিকাশের জন্য পারিবারিক প্রত্যাশা বা সামাজিক ধারণার বাইরে নিজের আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নাসার গবেষণায় অবদান রাখা মাহমুদা সুলতানার গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়। এটি বিজ্ঞানচর্চায় নারীর অংশগ্রহণ, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখানোর গল্প। তাঁর গবেষণার ধারণাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে দূরবর্তী গ্রহ ও তাদের উপগ্রহ অনুসন্ধানের পদ্ধতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আর তাঁর জীবনযাত্রা মনে করিয়ে দেয়, কোনো শিশুর সামনে উপযুক্ত উদাহরণ ও সুযোগ তুলে ধরতে পারলে তার স্বপ্নের পরিধিও অনেক বড় হতে পারে।

ট্যাগ: বাংলাদেশেরগর্বনাসামহাকাশগবেষণানারীবিজ্ঞানীবিজ্ঞানপ্রযুক্তি

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।