যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৩.৭ শতাংশে, পেট্রলের দাম এক মাসে বেড়েছে ৯.১ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বাড়ল মূল্যস্ফীতি! সেপ্টেম্বরে পেট্রলের দাম বেড়েছে ৯.১ শতাংশ, চাপে সাধারণ পরিবার, বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ।
যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ০.৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে গত ১২ মাসের হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশে, যা আগস্টের ৩.৪ শতাংশের চেয়ে বেশি। বিশেষ করে জ্বালানির বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ব্যয় নিয়ে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। সরকারি হিসাবে, সেপ্টেম্বরে পেট্রলের মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ৯.১ শতাংশ বেড়েছে। মাসিক সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি এই একটি খাতের কারণে হয়েছে। জ্বালানির সামগ্রিক মূল্যসূচকও এক মাসে ৫.২ শতাংশ বেড়েছে। ফলে ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াতকারী মানুষ এবং জ্বালানিনির্ভর ব্যবসার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত কয়েক মাসের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে মূল্যবৃদ্ধির গতি আরও স্পষ্ট হয়। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যসূচক মাসিক হিসাবে ০.৪ শতাংশ বেড়েছিল। সেপ্টেম্বরে সেই বৃদ্ধি দাঁড়ায় ০.৬ শতাংশে। বার্ষিক হিসাবেও মূল্যস্ফীতি ৩.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩.৭ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু এক মাসের সাময়িক পরিবর্তন নয়, সামগ্রিক মূল্যস্তরের ঊর্ধ্বমুখী চাপও নতুন সরকারি তথ্যে উঠে এসেছে।
জ্বালানির বাজারে এই বৃদ্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পেট্রলের দাম বাড়লে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, কর্মস্থলে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যেতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য ও সেবার দাম সমন্বয় করতে পারে। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়বে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পণ্যভেদে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারের চাহিদার প্রভাব আলাদা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক বাজারগত বিষয় কাজ করতে পারে। তাই কেবল একটি ঘটনাকেই সব মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো যথাযথ হবে না।
অন্যদিকে, খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন ছিল। সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খাদ্যের সামগ্রিক মূল্যসূচক মাসিক হিসাবে অপরিবর্তিত ছিল। বাড়িতে ব্যবহারের জন্য কেনা খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক ০.১ শতাংশ কমেছে। তবে রেস্তোরাঁসহ বাড়ির বাইরে খাবারের খরচ ০.২ শতাংশ বেড়েছে। গত এক বছরে সামগ্রিক খাদ্যসূচক ২.৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম একই সময়ে একইভাবে বেড়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
আবাসন খাতেও মূল্যচাপ অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরে আশ্রয় বা আবাসন-সংক্রান্ত মূল্যসূচক এক মাসে ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। গত ১২ মাসে এই সূচকের বৃদ্ধি ৩.২ শতাংশ। যেসব পরিবার ভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা এবং অন্যান্য নিয়মিত খরচ মেটাতে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করে, তাদের জন্য এসব খাতে ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি আর্থিক পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
খাদ্য ও জ্বালানির মতো ওঠানামাপ্রবণ খাত বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যস্ফীতিও উদ্বেগের কারণ। সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে এই সূচক মাসিক হিসাবে ০.৩ শতাংশ এবং বার্ষিক হিসাবে ২.৬ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে বার্ষিক মূল মূল্যস্ফীতি ছিল ২.৪ শতাংশ। আবাসন, ব্যবহৃত গাড়ি, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বিমানভাড়ার মতো কয়েকটি খাতেও সেপ্টেম্বরে মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। এতে বোঝা যায়, মূল্যচাপ কেবল পেট্রলের বাজারে সীমাবদ্ধ ছিল না।
মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে সুদের হার কমানোর সুযোগ সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে, সুদের হার বাড়ানো বা দীর্ঘ সময় বেশি রাখা হলে ঋণ, বাড়ি কেনা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগের খরচও বেশি থাকতে পারে। তবে নতুন মূল্যস্ফীতির তথ্যের ভিত্তিতে ফেডারেল রিজার্ভ কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরবর্তী মূল্যস্ফীতির তথ্যও বিবেচনায় আসবে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ভোটারদের কাছে পেট্রল, আবাসন, খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ সরাসরি দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মূল্যস্ফীতির এই তথ্য একাই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩.৭ শতাংশে পৌঁছানো এবং পেট্রলের মূল্যসূচকে ৯.১ শতাংশ মাসিক বৃদ্ধি অর্থনীতি ও সাধারণ পরিবারের ব্যয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। খাদ্যের সামগ্রিক মূল্যসূচক অপরিবর্তিত থাকলেও জ্বালানি, আবাসন এবং কয়েকটি পরিষেবা খাতে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আগামী মাসের সরকারি পরিসংখ্যান এবং ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্তের দিকে এখন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের নজর থাকবে।





