গ্রিনল্যান্ডে তেল গ্যাস খনিজ অনুসন্ধান শুরুর ঘোষণা ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক
নিরাপত্তার যুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডে ব্যাপক তেল, গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধান শুরুর কথা বলেছেন ট্রাম্প; তবে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে ব্যাপক তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান শুরুর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণায় আর্কটিক অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, সামরিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্ভাব্য হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
১৪ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ডে ব্যাপক তেল, গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধান শুরু হওয়ার প্রস্তুতির কথা জানান। তবে তাঁর বক্তব্য থেকে সব প্রকল্পের অনুমোদন, নির্দিষ্ট সময়সূচি কিংবা বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না। অনুসন্ধানের প্রস্তুতি, সরকারি অনুমতি এবং বাস্তবে সম্পদ উত্তোলন এগুলো পৃথক ধাপ।
গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত একটি বিশাল দ্বীপ। এটি ডেনমার্কের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও নিজস্ব সরকার ও বিস্তৃত স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। দ্বীপটির অবস্থান উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক পথের কাছাকাছি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক মহাকাশঘাঁটি রয়েছে। এই ঘাঁটি ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য উৎক্ষেপণ শনাক্ত করা, মহাকাশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তা করে। আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার গতিপথ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের বক্তব্যে এই নিরাপত্তাগত গুরুত্বের পাশাপাশি দ্বীপটির প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
গ্রিনল্যান্ডে বিরল মৃত্তিকা মৌলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরঞ্জাম, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে এসব খনিজের ব্যবহার রয়েছে। বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতায় তাই গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তবে খনিজের সম্ভাব্য মজুত থাকলেই তা সহজে উত্তোলন করা যায় না। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, দীর্ঘ শীতকাল, বরফাচ্ছাদিত এলাকা, পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ ও বন্দর অবকাঠামোর অভাব অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। কোনো অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পরিমাণে তেল বা গ্যাস রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা ও অনুসন্ধানমূলক খনন প্রয়োজন। এসব পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলেও পরবর্তী উৎপাদনের জন্য আরও বিনিয়োগ এবং অনুমোদন দরকার হয়।
গ্রিনল্যান্ডে তেল অনুসন্ধান নিয়ে এর আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দ্বীপটির সরকার ২০২১ সালে নতুন তেল অনুসন্ধানের অনুমতিপত্র দেওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের অনিশ্চয়তা এই নীতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা ছিল। ফলে বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পে খনন শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও সেটিকে গ্রিনল্যান্ডের সব অঞ্চলে নতুন করে তেল অনুসন্ধানের অনুমোদন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ২০২৬ সালের আগস্টের এক প্রতিবেদনে গ্রিনল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের জেমসন ল্যান্ড এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের তেল অনুসন্ধান পরিকল্পনার কথা উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুসন্ধানসংক্রান্ত সরঞ্জাম সেখানে পৌঁছানোর পর গ্রিনল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া সরঞ্জাম নামানোর অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ওই প্রকল্পের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং প্রযোজ্য পরিবেশগত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনা দেখায়, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকলেই অনুসন্ধান কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু করা যায় না।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের সম্পর্ক। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর একটি চুক্তি স্বাক্ষরের খবর প্রকাশিত হয়। রয়টার্সের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রিনল্যান্ডের আইনপ্রণেতাদের একটি বড় অংশ চুক্তিটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। চুক্তির আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয় রয়েছে। তবে চুক্তিটির বাস্তবায়ন, অনুমোদন এবং শর্তাবলি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা চলমান।
এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও খনিজ অনুসন্ধানের প্রশ্নটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রিনল্যান্ডে বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও দ্বীপটির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের। ডেনমার্কের সঙ্গে সাংবিধানিক সম্পর্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন, অনুমতিপত্র এবং পরিবেশগত শর্ত মানা জরুরি।
পরিবেশগত উদ্বেগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আর্কটিক অঞ্চলের পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তেল ছড়িয়ে পড়লে তা পরিষ্কার করা কঠিন হতে পারে, কারণ সেখানে উদ্ধারকারী অবকাঠামো সীমিত এবং আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হয়। খননকাজ স্থানীয় প্রাণী, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলার প্রবণতা নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করলেও তা পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে অনুসন্ধান সফল হলে গ্রিনল্যান্ডে কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও খনিজের দাম, পরিবেশগত ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগণের সম্মতি সবকিছু বিবেচনা না করে সম্ভাব্য লাভের হিসাব করা কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও প্রকল্পভিত্তিক তথ্য ছাড়া সম্ভাব্য উৎপাদন বা আয়ের নির্ভরযোগ্য পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
ট্রাম্পের ঘোষণা গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের নতুন প্রকাশ। তবে অনুসন্ধানের প্রস্তুতি ও বাস্তব উত্তোলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। নির্দিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদন, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং গ্রিনল্যান্ডের সরকারের সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। আগামী দিনে এ বিষয়ে সরকারি ঘোষণা, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অবস্থানই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।





