প্যারিসে শিক্ষার্থী-পুলিশ সংঘর্ষ তীব্র, বিক্ষোভ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ জোরালো হয়েছে; প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নেমেছেন উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ভূমিকা এবং তরুণদের আহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও ল্য মোঁদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশজুড়ে বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে এবং কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী প্যারিসেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিসের প্লাস দ্য লা নাসিওঁ এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রধান দাবি শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। কোথাও ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল, কোথাও শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতি নিয়েও একাংশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
ল্য মোঁদের ৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে প্রায় ৭১ হাজার ৫০০ মানুষ অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিদ্যালয়ের বাইরে আরও প্রায় ৫৫ হাজার তরুণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তবে সব বিক্ষোভ একই মাত্রায় সহিংস ছিল না। কয়েকটি শহরে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও প্যারিসসহ কিছু স্থানে মিছিলের শেষ পর্যায়ে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ দেখা দেয়।
আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক। বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করছে। বিভিন্ন ঘটনায় তরুণদের গুরুতর আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অন্যদিকে পুলিশপক্ষের বক্তব্য, সহিংসতা, পুলিশের ওপর হামলা এবং জননিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
রয়টার্সের ১০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের পদক্ষেপের সঙ্গে সম্পর্কিত ২৪টি ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী পুলিশের নিক্ষেপ করা কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারে মুখে আঘাত পেয়ে গুরুতর আহত হয়েছে বলে তার পরিবার ও আইনজীবী অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তবে ঘটনাটির দায় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভের সময় প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন এবং প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। একই সময়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৬ হাজার ৮৭৭-এ পৌঁছেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এসব সংখ্যা একাধিক দিনের ঘটনার সামগ্রিক হিসাব; এগুলোকে শুধু প্যারিসের একটি নির্দিষ্ট বিক্ষোভের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
আন্দোলনটি এখন শুধু শিক্ষা খাতের সমস্যা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। পুলিশের আচরণ, সামাজিক বৈষম্য, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন বিক্ষোভকারীদের একাংশ। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমিক সংগঠনের সমর্থন আন্দোলনের ব্যাপ্তি বাড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শহরে কর্মসূচি সমন্বয় করছেন।
তবে বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কিছু স্থানে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, আতশবাজি নিক্ষেপ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার তদন্ত করছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দাবি উঠেছে।
ফ্রান্সের সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং শিক্ষা খাতের সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে অসন্তোষের মূল কারণ দূর নাও হতে পারে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদেরও সহিংসতা এড়িয়ে দাবি তুলে ধরার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা ১৩ অক্টোবর নতুন করে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। ফলে আগামী দিনগুলোতে ফ্রান্সের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে সরকারের প্রতিক্রিয়া, আন্দোলনকারীদের অবস্থান এবং পুলিশের পদক্ষেপের ওপর। শিক্ষা খাতে সংস্কার, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা এই তিনটি বিষয়ই এখন দেশটির চলমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ।





