দিল্লিতে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহের সময় অন্তত ১২ সাংবাদিককে আটক করল পুলিশ আবার
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনবিরোধী বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ১২ সাংবাদিক আটক হন, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনবিরোধী বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ১২ সাংবাদিককে আটক করেছে পুলিশ। ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর, রোববার, বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিনে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদক ও চিত্রগ্রাহকদের আটক করার ঘটনা সামনে আসে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাঁদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। কয়েকজন সাংবাদিককে বাসে তুলে বিক্ষোভস্থল থেকে দূরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ নিয়ে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
১২ অক্টোবর প্রকাশিত হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করার সময় অন্তত ১২ সাংবাদিককে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে হিন্দুস্তান পত্রিকা, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং দ্য হিন্দু–এর সাংবাদিকদের নামও এসেছে। অন্যদিকে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, তাদের হিন্দি বিভাগের তিন সাংবাদিক শাশ্বত, সিয়া ও বিজয় কুমারকে রোববার আটক করা হয়েছিল। পরে প্রায় ৪৫ মিনিট পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁদের দাবি, সাংবাদিক পরিচয়পত্র দেখানোর পরও পুলিশ তাঁদের বাসে উঠতে বাধ্য করে এবং উত্তর দিল্লির ছত্রসাল স্টেডিয়ামের কাছে নামিয়ে দেয়। [সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস]
বিক্ষোভের কেন্দ্রীয় ইস্যু ছিল ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনকারীদের একাংশের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটাররাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি এসব অভিযোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, অযোগ্য ও একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার তালিকা নির্ভুল করাই সংশোধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য।
এই ইস্যুতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনসহ আন্দোলনকারীরা দিল্লিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। পাশাপাশি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা এআইএসএ–এর সদস্যরাও বিক্ষোভে অংশ নেন। বিক্ষোভের সময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি তৎপরতা, ব্যারিকেড এবং চলাচলে বিধিনিষেধ দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের আটকের ঘটনা অবশ্য শুধু ১১ অক্টোবরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর আগের দিন, ১০ অক্টোবরও দিল্লিতে বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছিল। নিউজলন্ড্রি, স্ক্রল, নবভারত টাইমসসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম তাদের সাংবাদিকদের আটকের কথা প্রকাশ করে। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু সাংবাদিকের ফোন ও সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে পরপর দুই দিন সাংবাদিকদের আটকের ঘটনা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ভারতের কয়েকটি সাংবাদিক সংগঠনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কর্পস, দিল্লি ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস এবং কেরালা ইউনিয়ন অব ওয়ার্কিং জার্নালিস্টসের দিল্লি শাখা যৌথভাবে সাংবাদিকদের আটক ও হয়রানির নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনগুলো ঘটনার তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে।
এদিকে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সাংবাদিক, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবীর দায়িত্ব পালনে অযথা বাধা না দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের আটকের ঘটনা পুলিশের ভূমিকা ও জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে প্রত্যেক সাংবাদিককে ঠিক কোন আইনি বিধানের অধীনে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। রাজনৈতিক বিক্ষোভ, নির্বাচন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাংবাদিকেরা যদি পরিচয়পত্র দেখানোর পরও সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আটক হন, তাহলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনসম্মত পদ্ধতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা।
তবে এ ঘটনায় পুলিশের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য, প্রত্যেক সাংবাদিকের আটকের নির্দিষ্ট কারণ এবং সব সাংবাদিক কখন মুক্তি পেয়েছেন, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত সরকারি তথ্য প্রয়োজন। তাই আটক হওয়া সাংবাদিকদের সংখ্যা ও ঘটনাপ্রবাহ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দিয়ে সমর্থিত হলেও, প্রতিটি অভিযোগকে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
দিল্লিতে বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ১২ সাংবাদিকের আটকের ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নকে একই সঙ্গে সামনে এনেছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, পুলিশের ব্যাখ্যা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপের ওপর এখন নজর থাকবে।





