প্রায় ৩০ কোটি টাকার পণ্য কোথায়? দায় নিচ্ছে না কেউ, ঢাকা বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
প্রায় ৩০ কোটি টাকার একটি আমদানি পণ্য চালান কোথায়—এ প্রশ্ন ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় আসা চালানটির বিপরীতে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা কাস্টমস হাউস। অন্যদিকে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ বলছে, চালানটি বিমানবন্দরের নিউ আইসিটি এলাকার পশ্চিম পাশে খোলা মাঠে ছিল এবং সেটির অবস্থান শনাক্ত করতে তল্লাশি চলছে। এ ঘটনায় কাস্টমস ও বিমান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমদানি করা পণ্যের নিরাপত্তা, কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, ভুয়া ইউডি ব্যবহার, পণ্য খালাসে অনিয়ম, চোরাচালানে সহযোগিতা ও অবৈধ অর্থ লেনদেনসহ একাধিক অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে শুল্ক ফাঁকি, পণ্য খালাসে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর বিষয়।
ডিসি আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকা থেকে বিল অব এন্ট্রি ছাড়াই প্রায় ৩০ কোটি টাকার পণ্য খালাস করা এবং চোরাচালান সিন্ডিকেটকে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ভুয়া বন্ড সুবিধা ও জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য খালাস এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
তদন্তের আবেদন:
এই দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ এনে সম্প্রতি সোহেল রানা নামের এক ব্যক্তি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন জমা দিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সূত্রের বরাতে অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন ডিসি আমিনুল ইসলাম। অভিযোগকারীর দাবি, তিনি নিজেকে পর্দার আড়ালে রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে পণ্য খালাস, চোরাচালানে সহযোগিতা, বিএসটিআইয়ের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই পণ্য খালাস এবং অবৈধভাবে অর্থ নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অনুসন্ধান চলমান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. আমিনুল ইসলাম ৩১তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। চাকরিজীবনে তিনি কাস্টম হাউস চট্টগ্রাম ও ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব কর্মস্থলেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল বলে লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
লিখিত অভিযোগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাসের বিষয়টিকে। অভিযোগ অনুযায়ী, এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেড, ইউরেনাস অ্যাপারেলস (প্রাইভেট) লিমিটেড এবং কুইক অ্যাপারেলস লিমিটেড নামে তিনটি বন্ধ বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাস করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কুরিয়ার চালানে আসা পণ্য ছাড়ের প্রক্রিয়ায় আমিনুল ইসলামের যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এ ঘটনায় কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ শাখার একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং একজন রাজস্ব কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করলে ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে চোরাচালান ও অবৈধভাবে পণ্য খালাসে সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে কাস্টমসের সরকার হানিফের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি হানিফ ও শরিফ নামে আরও দুই ব্যক্তির সঙ্গে আমিনুল ইসলামের যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে পণ্য খালাসের ঘটনায় ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে আমিনুল ইসলামের ভূমিকার বিষয়টিও সামনে আসতে পারে। এ কারণে ঘটনাটি ফৌজদারি মামলায় না নিয়ে অন্যভাবে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
শিশু খাদ্য ও প্রসাধনীজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কিছু পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না থাকার পরও প্রভাব খাটিয়ে সেগুলো খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব পণ্য ছাড়ের বিনিময়ে আমিনুল ইসলাম প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০ লাখ টাকা অবৈধভাবে নেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে বিপুল অর্থ লেনদেনের এই দাবির পক্ষে কোনো ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের রেকর্ড বা অন্য কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে ‘ক্লোজেট ক্লাউড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের এক নিকটাত্মীয়ের সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিআইএন ও টিআইএন নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাবিহা জাহানের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের পরিবারের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের সদ্য সাবেক সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের নামও এসেছে। অভিযোগকারীর দাবি, মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে আমিনুল ইসলাম বিভিন্ন অনিয়ম এবং অবৈধভাবে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মো. আমিনুল ইসলাম সিএসবিকে জানান, বিমানবন্দরের কার্গো এলাকা থেকে বিল অব এন্ট্রি ছাড়াই প্রায় ৩০ কোটি টাকার পণ্য খালাস করা এবং চোরাচালান করার কোনো সুযোগ নেই। বিমানবন্দরের দায়িত্ব বিমান কর্তৃপক্ষের। এ ঘটনায় ঢাকা কাস্টমস হাউস বিমানের কাছে চিঠি দিয়ে পণ্যের খোঁজ জানতে চেয়েছে।
কাস্টমসের নথি নম্বর ৫-কাস-৮ (০১) ফ্রেইট/গোপন সংবাদ/২০২৬/২১৯। চিঠির বিষয় ছিল এয়ারওয়েবিল নম্বর ৭৮৪-৬৯২৫৩৩৬৫-এর পণ্য চালানের বর্তমান অবস্থান জানানো প্রসঙ্গে।
চিঠিতে কাস্টমস উল্লেখ করে, গত ২০ জুন ২০২৬ তারিখে এয়ারওয়েবিল নম্বর ৭৮৪-৬৯২৫৩৩৬৫-এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, তৈরি পোশাক-সহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়। কাস্টমসের অ্যাসিকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম যাচাই করে দেখা যায়, উক্ত এয়ারওয়েবিলের বিপরীতে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি এবং পণ্য চালানটি খালাসের বিষয়ে এ দপ্তরের সিস্টেমে কোনো তথ্য নেই। অর্থাৎ, কাস্টমস আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এয়ারওয়েবিলের বিপরীতে কোনো পণ্য ঘোষণা দাখিল করা হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, কাস্টমসের চিঠির জবাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেড জানায়, এয়ারওয়েবিল নম্বর ৭৮৪-৬৯২৫৩৩৬৫-এর বিপরীতে ৫৬টি প্যাকেজে মোট ১ হাজার ৫২১ কেজি পণ্য ছিল। ফ্লাইট নম্বর CZ391/২০ জুন ২৬ এবং CZ5015/২০ জুন ২৬-এর মাধ্যমে চালানটি ঢাকায় আসে।
বিমানের জবাবি চিঠিতে বলা হয়, পণ্য চালানটি নিউ আইসিটি এলাকার পশ্চিম পাশে খোলা মাঠে ছিল। পণ্য চালানটির অবস্থান শনাক্ত করতে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। পণ্যটি খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাস্টমসকে অবহিত করা হবে বলেও চিঠিতে জানানো হয়। বিমানের চিঠির স্মারক নম্বর ৩০.৩৪.০০০০.০৬৭.০০৪.০১.০১.০১.২০২৬।
একজন ব্যবসায়ীর আমদানি করা পণ্য দেশের একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদ না থাকার ঘটনায় আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় পণ্য চালানটির বর্তমান অবস্থান, কার্গো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা এবং উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের দাবি উঠেছে।তিনি তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ গুলোকে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।




