উত্তর কোরিয়ার একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে জাপান সাগরে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ল
পিয়ংইয়ং থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত একটি নয়শর বেশি কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছে; দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, বাড়ছে উত্তেজনা।
উত্তর কোরিয়া থেকে ১২ অক্টোবর, সোমবার, জাপান সাগর অভিমুখে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের আশপাশের এলাকা থেকে স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টা ২০ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর অন্তত একটি ৯০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছে। জাপানও পৃথকভাবে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। তবে সব ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও পূর্ণাঙ্গ গতিপথ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন দুই কোরিয়ার মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক উৎক্ষেপণটি সিউলের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রতিক্রিয়া এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হতে পারে। তবে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে সোমবারের উৎক্ষেপণের উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সম্ভাব্য আরও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে সতর্ক থাকতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে তথ্য বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। এ ধরনের সহযোগিতার উদ্দেশ্য হলো, উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি বজায় রাখা।
জাপানের ক্ষেত্রেও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ দুটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে সমুদ্রে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সমুদ্রে পড়ার স্থান ও গতিপথ সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য পরবর্তী বিশ্লেষণে পরিবর্তিত হতে পারে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, জনগণকে যথাসময়ে অবহিত করা এবং বিমান, জাহাজসহ অন্যান্য সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
সোমবারের উৎক্ষেপণের আগে উত্তর কোরিয়া গত ৩ অক্টোবরও পূর্ব সাগর অভিমুখে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। পরদিন উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, দেশটির নেতা কিম জং উনের তত্ত্বাবধানে একটি মধ্যপাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পরীক্ষা ছিল তাদের কৌশলগত অস্ত্র পরিচালনাকারী সেনাদের প্রশিক্ষণের অংশ।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া গত ৮ অক্টোবর অতিদ্রুতগতির একটি ক্ষেপণাস্ত্রের উড্ডয়নপরবর্তী গ্লাইডযান পরীক্ষামূলকভাবে উৎক্ষেপণ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে, পিয়ংইয়ংয়ের সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকে সিউলের ওই পরীক্ষার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রকৃত ধরন, প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য এবং পরীক্ষার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
এখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অতিদ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়। অন্যদিকে, অতিদ্রুতগতির অস্ত্রব্যবস্থার কিছু ধরন শব্দের গতির পাঁচ গুণ বা তারও বেশি গতিতে চলতে পারে এবং উড্ডয়নের নির্দিষ্ট পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে সোমবার নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অতিদ্রুতগতির ছিল কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুই কোরিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন সীমান্তবর্তী অসামরিক এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিন দক্ষিণ কোরীয় সেনা আহত হন। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমান্ডের যৌথ তদন্তে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা স্থলমাইনকে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে ইয়োনহাপ জানিয়েছে। তবে পিয়ংইয়ং এ ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক প্রস্তাবে উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসংক্রান্ত কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া সর্বশেষ উৎক্ষেপণকে এসব প্রস্তাবের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া সাধারণত নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার যুক্তি তুলে ধরে অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে থাকে।
সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শুধু অস্ত্রের পাল্লা বা গতি যাচাইয়ের বিষয় নয়; এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টাও থাকতে পারে। তবে সোমবারের উৎক্ষেপণের পেছনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সব তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান নজরদারি জোরদার রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথ্য বিনিময় চালিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন, সঠিক সংখ্যা, উড্ডয়নপথ ও পরীক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশিত হলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব হবে। আপাতত প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর উত্তর কোরিয়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলো ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।





