মার্কিন বৈদেশিক সহায়তা বিতরণের তালিকায় ২০তম বাংলাদেশ, ২০২৫ অর্থবছরে পেয়েছে প্রায় ৩৯৪ মিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা বিতরণের তালিকায় ২০তম বাংলাদেশ। ২০২৫ অর্থবছরে বিতরণ করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলার, সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ নিয়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে প্রায় ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলার বৈদেশিক সহায়তা বিতরণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সহায়তার তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা ইউএসএফ্যাক্টসের প্রকাশিত উপাত্তে বাংলাদেশের জন্য বিতরণ করা অর্থের পরিমাণ ৩৯৩ কোটি নয়, বরং ৩৯ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫৮৪ ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৩৯৪ মিলিয়ন ডলার। এই হিসাবকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সহায়তা বণ্টনে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে পরিসংখ্যানটি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। এখানে উল্লেখ করা অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাব অনুযায়ী বিতরণ করা বৈদেশিক সহায়তা। এটি বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতে বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, অনুমোদিত বাজেট কিংবা কোনো একটি প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সমান নয়। সহায়তার অর্থ বাস্তবে সরকারি হিসাব থেকে ছাড় হওয়ার সময়কে ভিত্তি করেই বিতরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থবছর অক্টোবরের প্রথম দিন শুরু হয়ে পরবর্তী বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিনে শেষ হয়। সে অনুযায়ী ২০২৫ অর্থবছর ছিল ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন মার্কিন সরকারি সংস্থা ও সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। ফলে এই পরিসংখ্যানকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে বাংলাদেশকে দেওয়া অর্থ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
আন্তর্জাতিক তুলনায় ইউক্রেন ছিল ২০২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক সহায়তা গ্রহীতা। দেশটি পেয়েছে প্রায় ৬৭৫ কোটি ডলার। ইসরায়েল পেয়েছে প্রায় ৩৩১ কোটি ডলার এবং জর্ডান পেয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার। এরপর ইথিওপিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, নাইজেরিয়া, সুদান, কেনিয়া, মোজাম্বিক ও উগান্ডার মতো দেশ রয়েছে শীর্ষ সহায়তাপ্রাপ্ত দেশগুলোর তালিকায়। এসব দেশের সহায়তার পরিমাণে যুদ্ধ, নিরাপত্তা, মানবিক সংকট ও উন্নয়ন কর্মসূচির প্রভাব রয়েছে ।
বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে প্রকাশিত তালিকায় ২০তম স্থানের কথা বলা হলেও সেটিকে নির্দিষ্ট হিসাবপদ্ধতির প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা উচিত। বিভিন্ন সংস্থা তথ্য হালনাগাদ করার সময় নতুন হিসাব যুক্ত হতে পারে। কোনো তালিকায় মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করা হয়েছে কি না, কোন ধরনের সহায়তা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং কোন তারিখে উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে এসব বিষয়ও অবস্থান নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাংলাদেশের অবস্থানকে সব ধরনের মার্কিন সহায়তার স্থায়ী বৈশ্বিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাস এবং মানবিক সহায়তার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ দেশে দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি, জরুরি খাদ্য সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তাও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আশ্রয় এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা প্রয়োজন। এ ধরনের কর্মসূচিতে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি সহায়তা সময়মতো পৌঁছাচ্ছে কি না এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা সুবিধা পাচ্ছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্যভান্ডারে বাংলাদেশের জন্য ২০২৫ অর্থবছরে প্রতিশ্রুত সহায়তার পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় ৩১ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। এই অঙ্কটি বাস্তবে বিতরণ করা প্রায় ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের হিসাব থেকে আলাদা। প্রথমটি প্রতিশ্রুত অর্থের হিসাব, আর দ্বিতীয়টি বিতরণ করা অর্থের হিসাব। এই দুই ধরনের পরিসংখ্যানকে এক করে উপস্থাপন করলে পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। সরকারি তথ্যভান্ডারের উপাত্ত হালনাগাদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশ্রুত অর্থের হিসাবও পরিবর্তিত হতে পারে।
বৈদেশিক সহায়তার অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, ব্যয়ের জবাবদিহি এবং ফলাফল মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অর্থ ব্যয় হলে তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। পাশাপাশি নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৯৪ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা বিতরণের তথ্য প্রকাশিত উপাত্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ২০তম অবস্থানকে নির্দিষ্ট তালিকা ও হিসাবপদ্ধতির ভিত্তিতে উল্লেখ করতে হবে। বিতরণ করা অর্থ এবং প্রতিশ্রুত সহায়তার পার্থক্য স্পষ্ট রাখাই হবে নির্ভুল সংবাদ প্রকাশের প্রধান শর্ত।





