সৌদি-ইরান আলোচনায় নতুন মোড়, ইয়েমেন সংকট সমাধানে সংলাপের প্রস্তাব তেহরানের
ইয়েমেন সংঘাত নিরসনে সামরিক পথের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানিয়ে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে আলোচনায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।
Desk Reporter
সিএসবি নিউজ ইউএসএ
সৌদি-ইরান আলোচনায় নতুন মোড়, ইয়েমেন সংকট সমাধানে সংলাপের প্রস্তাব তেহরানের
৬ মিনিটে পড়ুন
ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপে রাজনৈতিক সমাধান ও উত্তেজনা কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, বর্তমান সংকটগুলোর কোনো সামরিক সমাধান নেই। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তেহরান। ১১ অক্টোবরের এই ফোনালাপের বিষয়টি সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে ফোনালাপটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, দুই মন্ত্রী সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলমান প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেন। ইরানের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বক্তব্যে আরাঘচি সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন এবং সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ সহজ করতে সহায়তার প্রস্তাব জানান।
এই আলোচনার গুরুত্ব শুধু দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক নৌপথের সুরক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সামরিক উত্তেজনা—সবকিছুর সঙ্গে বিষয়টি জড়িত। সৌদি আরব ও ইরান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে পরিচিত। তাই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ অব্যাহত থাকা এবং সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক পথ নিয়ে আলোচনা করা কূটনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফোনালাপের আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুথিদের হামলার খবর সামনে আসে। এর মধ্যে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এপি জানায়, ১০ অক্টোবর বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রথমে ১২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরে আহতদের মধ্যে আরও একজনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। হামলায় তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে একই বিমানবন্দর এলাকায় আবারও হামলার খবর আসে।
এই ঘটনাগুলো সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা শুধু মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং বিমান চলাচল, আন্তর্জাতিক যাতায়াত, ব্যবসা এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের হামলার পর সামরিক পাল্টা পদক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই রাজনৈতিক সংলাপের প্রস্তাবকে বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে হামলার ঘটনাগুলো এবং ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। হুথি গোষ্ঠী ইয়েমেনের সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। অন্যদিকে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখেছে। ইরানের সঙ্গে হুথিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে হুথিদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা হামলার জন্য ইরানের সরাসরি নির্দেশ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। এখানে আরাঘচির প্রস্তাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ইরান নিজেকে শুধু সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং আলোচনার পথ তৈরিতে সহায়তাকারী পক্ষ হিসেবেও উপস্থাপন করতে চাইছে। তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক চাপ বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বিরোধের মূল কারণ নিয়ে আলোচনা করা জরুরি। তবে ইরানের এই অবস্থান কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নির্ভর করবে সৌদি আরব, ইয়েমেনের বিভিন্ন পক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবরণে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনাকে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং তা মোকাবিলার প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে সৌদি বিবরণে ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে প্রস্তাবটি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়েছে, নির্দিষ্ট আলোচনার তারিখ ঠিক হয়েছে কিংবা কোনো মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রকাশ্য তথ্য এখনো নেই।
ইয়েমেনের সংঘাতের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মানবিক সংকট। ২০১৪ সালে হুথি গোষ্ঠী রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশটির সংঘাত আরও জটিল হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করে। পরবর্তী বছরগুলোতে সংঘাতের কারণে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট গভীর হয়েছে।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগের পর ইয়েমেনের সংঘাতে তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় দেশটিতে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের খবর আবারও পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এই অবস্থায় সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে আলোচনার পথ তৈরি করা গেলে তা উত্তেজনা কমানোর একটি সুযোগ হতে পারে। তবে কেবল দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হলেই ইয়েমেনের সব পক্ষের বিরোধ মিটে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় হুথি গোষ্ঠী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার এবং দেশটির অন্যান্য রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পক্ষের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও সেটি বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে সংঘাত কমানো, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে ঐকমত্য তৈরি করা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে বন্দি বিনিময়, মানবিক সহায়তা, বন্দর ও বিমানবন্দরের কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে যোগাযোগের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই প্রক্রিয়া দেখিয়েছিল, দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং ইয়েমেনের মতো জটিল সংঘাতের স্থায়ী সমাধান এক বিষয় নয়। ইয়েমেনের রাজনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ এখানে বড় বাধা হয়ে থাকতে পারে। এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরসংলগ্ন নৌপথ বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকায় সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচলের ব্যয়, বীমার খরচ এবং পণ্য পরিবহনের সময় বেড়ে যেতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমস্যা নয়; এর প্রভাব আঞ্চলিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে আরাঘচির বক্তব্যকে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু বক্তব্য এবং বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবের সম্মতি, ইয়েমেনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণ এবং আলোচনার জন্য গ্রহণযোগ্য কাঠামো প্রয়োজন। পাশাপাশি হামলা বন্ধ করা, বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি কমানোর মতো বাস্তব পদক্ষেপও জরুরি।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ১১ অক্টোবর সৌদি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরান সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ সহজ করতে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কিন্তু এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে বা দুই পক্ষ কোনো চুক্তিতে পৌঁছেছে এমন তথ্য নিশ্চিত নয়।