ব্রেকিং
উত্তর কোরিয়ার একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে জাপান সাগরে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়লরিয়াদে হামলাকে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা পাকিস্তানের, সৌদির নিরাপত্তায় সর্বাত্মক সহযোগিতার অঙ্গীকার২০২৮ সালের নির্বাচনে ফিরবেন কমলা হ্যারিস? মধ্যবর্তী ভোটে ডেমোক্র্যাটদের জয় ঘিরে নতুন জল্পনাপ্যারিসে শিক্ষার্থী-পুলিশ সংঘর্ষ তীব্র, বিক্ষোভ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনাগাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে, পশ্চিম তীরে জলপাই চাষিরা আক্রমণের শিকার

গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে, পশ্চিম তীরে জলপাই চাষিরা আক্রমণের শিকার

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় প্রাণহানি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত, আর পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা জলপাই চাষিদের জীবিকা ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে, পশ্চিম তীরে জলপাই চাষিরা আক্রমণের শিকার
গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে, পশ্চিম তীরে জলপাই চাষিরা আক্রমণের শিকার

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছর পরও সংঘাতের অবসান ঘটেনি। ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণ, বিমান হামলা, পুনর্গঠনের অচলাবস্থা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত করছে। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, জমিতে প্রবেশে বাধা এবং গাছ ধ্বংসের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে এই দুই অঞ্চলের পরিস্থিতির অবনতির চিত্র উঠে এসেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১২ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত দুজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা একজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে হামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এর আগের রাতেও খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি তাঁবুতে হামলার খবর পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় তিনজন নিহত হওয়ার কথা স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। এর লক্ষ্য ছিল বড় ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করা, জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার পুনর্গঠন শুরু করা। কিন্তু এক বছর পরও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ১০ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ, নিরস্ত্রীকরণ, সেনা প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠন নিয়ে মতবিরোধের কারণে শান্তিপ্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

রয়টার্সের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এক হাজার চারশর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এসব সংখ্যা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব; প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন যাচাই সব সময় সম্ভব হয়নি। ইসরায়েল বলছে, হামাসের সামরিক তৎপরতা ও নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের অভিযান চালানো হচ্ছে। হামাস পাল্টা অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি হামলা ও নিয়ন্ত্রণ শান্তিপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।

গাজার মানবিক পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। দীর্ঘ সংঘাতে বহু বাড়িঘর, হাসপাতাল, সড়ক, পানি সরবরাহব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো অস্থায়ী তাঁবু, ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন কিংবা অপর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। নিরাপদ পানির অভাব, পয়োনিষ্কাশনের দুরবস্থা, চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি এবং সংক্রামক রোগের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহায়তা প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি জরুরি সেবা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে।

গাজার বাইরে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও সহিংসতা বাড়ছে। বিশেষ করে অক্টোবরের জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে কৃষকদের নিরাপত্তা, জমিতে প্রবেশাধিকার এবং ফসল রক্ষার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর কাছে জলপাই শুধু খাদ্য বা কৃষিপণ্য নয়; এটি বহু প্রজন্মের জীবিকা, জমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলপাই থেকে তেল উৎপাদন ও বিক্রির আয় দিয়ে অনেক পরিবার সারা বছরের ব্যয় মেটায়। ফলে গাছ কেটে ফেলা, ফসল লুট করা কিংবা কৃষকদের জমিতে যেতে বাধা দেওয়ার প্রভাব একটি মৌসুমের ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

অক্টোবরের শুরুতে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন স্থানে জলপাই সংগ্রহ করতে গিয়ে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ৭ অক্টোবরের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীদের গুলিতে একজন ফিলিস্তিনি নিরাপত্তাকর্মী নিহত এবং আরও ১৬ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ঘটনাটির বিবরণ ও দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। ৬ অক্টোবর পশ্চিম তীরের আকরাবা এলাকার কাছে ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রী জাফর আশতিয়েহের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলার খবরও প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। তিনি জলপাই সংগ্রহের সময়কার সহিংসতা নথিবদ্ধ করছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের ২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং কৃষিজমিতে প্রবেশের বাধাকে বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকা হারানোর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ৫০টির বেশি হামলার কথা উল্লেখ করা হয়, যেগুলোতে মানুষ আহত হওয়া অথবা বাড়িঘর ও কৃষিসম্পদের ক্ষতি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে জলপাইগাছ ও অন্যান্য কৃষিসম্পদের ক্ষতির খবরও নথিভুক্ত করা হয়েছে।

জাতিসংঘের সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের এমন এক হাজার চারশর বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেগুলোতে হতাহত বা সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে। এসব ঘটনা বহু ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করেছে। চলাচলের বিধিনিষেধ, বসতি সম্প্রসারণ এবং জমিতে প্রবেশের বাধা কৃষিকাজ ও অন্যান্য মৌলিক সেবা গ্রহণকে কঠিন করে তুলছে। তবে নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা এবং প্রতিটি ঘটনার আইনি দায় নির্ধারণ এক বিষয় নয়; তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করতে হয়।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অধিকৃত অঞ্চলে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের সম্পত্তি ও জীবিকার ওপর বেআইনি আক্রমণ প্রতিরোধ করা দখলদার কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বসতি স্থাপন ও ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের আপত্তি রয়েছে। ইসরায়েল এসব বিষয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা ও আইনি যুক্তি তুলে ধরে; তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী—এটাই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বহুল স্বীকৃত অবস্থান।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় যুদ্ধবিরতি টেকসই করতে হলে শুধু বড় ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখলেই চলবে না। বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা, সেনা প্রত্যাহার, কার্যকর প্রশাসন এবং পুনর্গঠনের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি জরুরি। পশ্চিম তীরেও কৃষকদের নিরাপদে জমিতে যাওয়া, সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, গাজায় যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও প্রাণহানি ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের অব্যাহত খবর এবং পশ্চিম তীরে জলপাই চাষিদের ওপর হামলা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা তুলে ধরছে। সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো নিরাপদ জীবন, নিজেদের জমিতে প্রবেশের অধিকার, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং সহিংসতার অবসান। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তিতে রূপান্তর করা কঠিন হবে।

ট্যাগ: ফিলিস্তিনগাজাপশ্চিমতীরজলপাইচাষি

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।