বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখনো অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারের অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১০.৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.১ শতাংশ বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এই প্রবৃদ্ধি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সব বাজারে পরিস্থিতি এক রকম নয়। বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি কমলেও নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটিতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। এই তিন মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বাজারে রপ্তানি বেড়েছে ৩.৩৩ শতাংশ। ইউরোপের বাজার বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানকার ক্রেতাদের কাছে নিট পোশাক, ডেনিম, শার্ট ও বিভিন্ন ধরনের তৈরি পোশাকের চাহিদা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অন্যতম প্রধান বাজার। নতুন অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটিতে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২.২২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৪ শতাংশ বেশি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বেড়েছে ৫.৯৪ শতাংশ এবং কানাডায় বেড়েছে ৩.৮৫ শতাংশ। এসব বাজারের ইতিবাচক ফল সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (ওটেক্সা) তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৭৫ শতাংশ কমে প্রায় ৪.০১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিও কমেছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের পেছনে বাজারের সামগ্রিক সংকোচন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা দুটি বিষয়ই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোর উপস্থিতি বাড়ছে। এসব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য শুধু কম দামে পোশাক উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়। ক্রেতারা এখন পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ, উৎপাদনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শ্রমিকদের কর্মপরিবেশকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে রপ্তানিকারকদের উৎপাদনব্যবস্থা আধুনিক করা এবং ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়ানো প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রচলিত বাজারের বাইরের দেশগুলোতেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সুযোগ বাড়ছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি ৯.৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১.৮১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মোট পোশাক রপ্তানিতে এসব বাজারের অংশ ছিল প্রায় ১৭.১৩ শতাংশ। নতুন ক্রেতা ও বাজার তৈরির এই প্রবণতা ভবিষ্যতে কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
পণ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। প্রথম প্রান্তিকে নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৬.৮৮ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫.১১ শতাংশ। নিট পোশাকের মধ্যে টি-শার্ট, সোয়েটারসহ বিভিন্ন ধরনের বোনা পোশাক রয়েছে। অন্যদিকে, ওভেন পোশাকের মধ্যে শার্ট, ট্রাউজার ও ডেনিমজাতীয় পণ্য অন্তর্ভুক্ত। উভয় বিভাগে প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়।
তবে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি মানেই সব কারখানার ব্যবসা সমানভাবে ভালো চলছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, ঋণের খরচ, কাঁচামালের মূল্য এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতিযোগিতামূলক দাম পাওয়ার বিষয়গুলো কারখানার মুনাফাকে প্রভাবিত করতে পারে। রপ্তানির মূল্য বাড়লেও উৎপাদন খরচ দ্রুত বাড়লে প্রকৃত মুনাফা সীমিত থাকতে পারে। এ কারণে রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, অর্ডারের পরিমাণ, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ এবং কারখানার আর্থিক অবস্থাও মূল্যায়ন করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কও পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানোর কাঠামো এবং নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের জন্য শূন্য শতাংশ পারস্পরিক শুল্কের ব্যবস্থা তৈরির কথা বলা হয়েছিল। তবে এই সুবিধা নির্দিষ্ট পণ্য, শর্ত ও পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সব বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক প্রযোজ্যএমন দাবি সঠিক হবে না।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাজার বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলাও জরুরি। এসব পদক্ষেপ শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৬.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত দিলেও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এখনো রয়েছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানির প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করে শিল্পের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হবে। আগামী মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের মান বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।





