রিয়াদে হামলাকে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা পাকিস্তানের, সৌদির নিরাপত্তায় সর্বাত্মক সহযোগিতার অঙ্গীকার
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় দেশটির পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আগ্রাসন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং দুই দেশের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তি ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ইসলামাবাদ রিয়াদকে সম্ভাব্য সব উপায়ে সহযোগিতা করবে।
১১ অক্টোবর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রকাশিত প্রতিবেদনে শাহবাজ শরিফের এই অবস্থানের কথা জানানো হয়। এর আগে রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার নিন্দা জানান। তিনি হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর শনিবার সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। হামলার পর হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। পরদিন ১১ অক্টোবর বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনাল লক্ষ্য করে আরেকটি হামলার খবর পাওয়া যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দ্বিতীয় হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব ঘটনায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনকে হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে। হুথিদের পক্ষ থেকেও হামলার দায় স্বীকারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে সংঘাতের প্রতিটি ঘটনার দায়, ক্ষয়ক্ষতি ও সামরিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
শাহবাজ শরিফ হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে সৌদি আরবের নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি পাকিস্তানের সংহতির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেছেন, বেসামরিক নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের হামলা শুধু একটি দেশের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং বৃহত্তর অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকেও বিপন্ন করে।
পাকিস্তানের এই অবস্থানের পেছনে দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, ধর্মীয় ও প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সম্পর্ক বহুদিনের। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি নাগরিক বসবাস ও কাজ করেন। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে সেখানে কর্মরত পাকিস্তানি নাগরিকদের নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি ইসলামাবাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। পাকিস্তানের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটি সৌদি আরবের বৈধ আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে এবং দেশটির শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার বিষয়ে সংহতি প্রকাশ করেছে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রাজনৈতিক ঘোষণা, আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। তাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের সহযোগিতার কথা বললেও তাঁর বক্তব্যকে নির্দিষ্ট হামলার জবাবে পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
রিয়াদে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আক্রান্ত হলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। সৌদি আরব বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ হওয়ায় দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সামনে একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বজায় রাখা, অন্যদিকে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়া ঠেকানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। তাই হামলা বন্ধ করা, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার পর শাহবাজ শরিফের বক্তব্য সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের দৃঢ় রাজনৈতিক সমর্থন তুলে ধরেছে। দুই দেশের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তি ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ইসলামাবাদ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। তবে এই অঙ্গীকার বাস্তবে কী ধরনের পদক্ষেপে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দুই দেশের সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।





