রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত, ফ্লাইট বাতিলে ঢাকায় আটকে হাজারো যাত্রী
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত ও ২৪ জন আহত; নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ঢাকা-সৌদি আরব রুটের আটটি ফ্লাইট ব্যাহত হয়েছে আজ।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৪ বাংলাদেশি। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ঢাকা ও সৌদি আরবের মধ্যে একাধিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে সৌদি আরবগামী এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা হাজারো যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন। বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস এবং প্রথম আলো ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাসসের ১১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৩-এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৪ জন আহত হন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় মোট ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশি হতাহতদের তথ্য প্রকাশ করে।
নিহত দুই বাংলাদেশি হলেন মো. শাহেদ আহমেদ ও মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরী। শাহেদ আহমেদের বাড়ি বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামে। তিনি সৌদি আরবের জেদ্দায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর দেশে ছুটি কাটিয়ে জেদ্দায় কর্মস্থলে ফিরছিলেন তিনি। পথে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় প্রাণ হারান।
অন্যদিকে, মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরীর বাড়ি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামে। তিনি ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষা করার সময় হামলার শিকার হন তিনি। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুতে দেশে তাঁদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রথম আলো ইংরেজি সংস্করণের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহত ২৪ বাংলাদেশির মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর ছিল। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ দূতাবাস আহতদের পরিচয়, চিকিৎসার অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ও হাসপাতালগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
ঘটনার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ১১ অক্টোবর বাসসে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের জীবন ও অবকাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে এমন হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে, হামলার কারণে ঢাকা-রিয়াদ রুটে বিমান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে। বাসসের ১১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা থেকে সৌদি আরবগামী এবং সৌদি আরব থেকে ঢাকাগামী মোট আটটি ফ্লাইটের যাত্রা ব্যাহত হয়েছিল। এসব ফ্লাইটে মোট ২ হাজার ৯৫১ জন যাত্রীর বুকিং ছিল। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারের দুটি ফ্লাইট ছিল।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের বিজি৩৩৯ ও বিজি৩৪০ ফ্লাইটের কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিতে বলা হয়। তবে ফ্লাইটের সময়সূচি পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ১২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাইট বাতিলের কারণে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই হাজারের বেশি সৌদিগামী যাত্রী আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবগামী ব্যক্তি, ওমরাহযাত্রী এবং দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরাও ছিলেন। যাত্রীদের অনেকেই বিকল্প ফ্লাইট, হোটেল, খাবার এবং যাত্রার নতুন সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন।
এ পরিস্থিতিতে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যাঁদের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে, তাঁদের টিকিটের অবস্থা, বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য পুনর্নির্ধারিত সময় সম্পর্কে সরাসরি এয়ারলাইনসের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পুরোনো বা যাচাইহীন সময়সূচির ওপর নির্ভর না করাই নিরাপদ।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও হামলাটি উদ্বেগ তৈরি করেছে। রয়টার্সের ১১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সৌদি আরবের আকাশসীমায় চলাচলকারী মার্কিন বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যাত্রীদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করার গুরুত্বও বেড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনা শুধু একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংকট নয়; এটি প্রবাসী শ্রমিক, ওমরাহযাত্রী এবং তাঁদের পরিবারের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করা উচিত। ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে কি না, আহতদের চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা কী এবং যাত্রীদের বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা কতটা সম্পন্ন হয়েছে এসব বিষয়ে নতুন সরকারি তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে হালনাগাদ করা প্রয়োজন।





