রাখাইন নির্বাচনে রোহিঙ্গা পরিচয় বদলের চাপ, ১১ বছর পর মুখ খুললেন সাবেক সংসদ সদস্য
মিয়ানমারের সাবেক সংসদ সদস্য শোয়ে মংয়ের নতুন বক্তব্যে ২০১৫ সালের নির্বাচন, রোহিঙ্গা পরিচয় এবং নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে।
লিখেছেন Desk Reporter- সিএসবি নিউজ ইউএসএ
প্রকাশিত
রাখাইন নির্বাচনে রোহিঙ্গা পরিচয় বদলের চাপ, ১১ বছর পর মুখ খুললেন সাবেক সংসদ সদস্য
৯০০ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
িয়ানমারের সাবেক সংসদ সদস্য শোয়ে মংয়ের দাবি, ২০১৫ সালের জুলাইয়ে দেশটির প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা উ অং থাং তাঁকে রোহিঙ্গা পরিচয় ত্যাগ করে ‘বাঙালি’ পরিচয় গ্রহণের পক্ষে অবস্থান নিতে বলেছিলেন। ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত দ্য ডিপ্লোম্যাট সাময়িকীতে নিজের লেখা নিবন্ধে তিনি এই অভিযোগ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টির সঙ্গে এই অবস্থান পরিবর্তনের প্রশ্নটি জড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে ঘটনাটি নিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়, এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
২০১৫ সালের সেই কথোপকথন প্রকাশ্যে আনার পেছনে নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে সামনে আনার উদ্দেশ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন শোয়ে মং। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি; বরং উত্তর রাখাইনের বুথিডং এলাকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজেদের কী নামে পরিচয় দেবে, সেই প্রশ্নও আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। তিনি তখন মিয়ানমারের সংসদের নিম্নকক্ষের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং আসন্ন নির্বাচনে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
শোয়ে মংয়ের বর্ণনা অনুসারে, উ অং থাং তাঁকে জানিয়েছিলেন যে তিনি, ক্ষমতাসীন সংহতি ও উন্নয়ন দলের নেতৃত্ব, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি উ থেইন সেইন এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। শোয়ে মংয়ের দাবি, তাঁকে নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষকে ‘বাঙালি’ পরিচয় গ্রহণে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমে এমন বক্তব্য দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল যে রোহিঙ্গা বলে কোনো জাতিগত পরিচয় নেই, সবাই বাঙালি। তাঁর অভিযোগ, ব্যক্তিগত বৈঠকের কথা প্রকাশ না করেই তাঁকে এই বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল।
এই অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শোয়ে মংয়ের দাবি অনুযায়ী, তাঁর ভবিষ্যৎ সংসদীয় মনোনয়নের বিষয়টিও ওই অবস্থান গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তবে এই বক্তব্য উ অং থাংয়ের নিজের ভাষ্য নয়; এটি বৈঠকে উপস্থিত থাকার দাবি করা শোয়ে মংয়ের স্মৃতিচারণ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বা সেনাপ্রধান সরাসরি তাঁকে এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন, এমন দাবিও শোয়ে মং করেননি। বরং তাঁর বক্তব্য, উ অং থাং তাঁদের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ফলে এই অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট অন্য নেতারা সরাসরি এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
শোয়ে মংয়ের বিবরণে আরও বলা হয়েছে, বৈঠকের সময় উ অং থাং তাঁর সামনে তৎকালীন অভিবাসনমন্ত্রী উ খিন ইয়ের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন। শোয়ে মংয়ের দাবি, আলোচনার বিষয়টি নিয়ে ওই ফোনালাপের মাধ্যমে সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ফোনালাপের কোনো অডিও, লিখিত নথি কিংবা স্বাধীন সাক্ষীর বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এই কারণে ঘটনাটির ওই অংশও আপাতত তাঁর ব্যক্তিগত বর্ণনা হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শোয়ে মং জানান, তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি। তাঁর যুক্তি ছিল, রাজনৈতিক পদ ধরে রাখা বা নাগরিকত্বের কাগজপত্র পাওয়ার সম্ভাবনার বিনিময়ে নিজের জনগোষ্ঠীর পরিচয় অস্বীকার করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি মনে করতেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব হলো জনগণের অধিকার রক্ষা করা, তাঁদের পরিচয় পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উ অং থাং তাঁকে বিষয়টি নিয়ে নিজের এলাকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে তিনি স্থানীয় নেতাদের ও নিজের সমর্থকদের বিষয়টি জানান এবং তাঁদের সমর্থন পান বলে দাবি করেন।
এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে ২০১৫ সালের মিয়ানমারের পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। সে সময় দেশটিতে সামরিক শাসন থেকে সীমিত বেসামরিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উত্তরণের প্রক্রিয়া চলছিল। একই বছরের ৮ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনে কোন জনগোষ্ঠী অংশ নিতে পারবে, কারা ভোট দিতে পারবে এবং কারা প্রার্থী হতে পারবে এসব প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। রোহিঙ্গাদের পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ তখনও মীমাংসিত হয়নি।
শোয়ে মং ২০১০ সালের নির্বাচনে বুথিডং এলাকা থেকে সংহতি ও উন্নয়ন দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ২০১৫ সালের নির্বাচনে আবারও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ই ওই বৈঠক হয়। তিনি জানান, পরিচয় পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর ৪ আগস্ট ২০১৫ তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন। এর দুই দিন পর স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু তাঁর নির্বাচনী লড়াই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। শোয়ে মংয়ের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ২২ আগস্ট মংডু জেলা নির্বাচন উপকমিশন তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করে। সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, তাঁর জন্মের সময় তাঁর বাবা-মা মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন না। তিনি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাখাইন রাজ্যের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন। ১ সেপ্টেম্বর সেই আবেদনও খারিজ হয়। পরে ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশনও সিদ্ধান্ত বহাল রাখে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শোয়ে মং তাঁর দলত্যাগ, স্বাধীন প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা এবং প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনাগুলোকে পরিচয় নিয়ে চাপের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। কিন্তু তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কারণেই তাঁকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছিল। একইভাবে, প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বৈঠকে আলোচিত কথিত প্রস্তাবের সরাসরি যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আরও নথি ও স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন।
শোয়ে মংয়ের এই বক্তব্য প্রকাশের সময় নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। তাঁর দাবি, বৈঠকটি হয়েছিল ২০১৫ সালের জুলাই মাসে। কিন্তু উ অং থাং ২৩ জুলাই ২০১৫ সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ৭৪ বছর। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম মিজিমা ২৭ জুলাই তাঁর শেষকৃত্যের খবর প্রকাশ করে এবং জানায়, ৮ জুলাই অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়েছিল।
এই সময়রেখা থেকে বোঝা যায়, জুলাই মাসে বৈঠক হয়ে থাকলে তা উ অং থাংয়ের মৃত্যুর আগেই হওয়ার কথা। তাই তাঁর মৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে শোয়ে মংয়ের বক্তব্যের সরাসরি কোনো সময়গত বিরোধ নেই। তবে বৈঠকের সুনির্দিষ্ট তারিখ জানা না থাকায় ঘটনাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত। শোয়ে মং যে ১১ বছরেরও বেশি সময় পর এই অভিযোগ প্রকাশ করেছেন, তার একটি কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, তখন মিয়ানমারে বসবাস করে এমন বক্তব্য প্রকাশ করলে রাজনৈতিক পরিণতির আশঙ্কা ছিল।
উ অং থাং মিয়ানমারের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সাবেক সামরিক সরকারের সময় শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে সংহতি ও উন্নয়ন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। ২০০৩ সালে বিরোধী নেত্রী অং সান সু চির গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার অভিযোগও উঠেছিল। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে; সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংস্কার বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগও আনা হয়েছিল। এসব বিষয় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও বিতর্কিত অতীতের অংশ, তবে এগুলো শোয়ে মংয়ের বর্ণিত ব্যক্তিগত বৈঠকের সত্যতা নিজে থেকে প্রমাণ করে না।
রোহিঙ্গা পরিচয়ের প্রশ্নটি মিয়ানমারে কেবল নামের বিতর্ক নয়। এর সঙ্গে নাগরিকত্ব, পরিচয়পত্র, ভোটাধিকার, শিক্ষা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মতো মৌলিক বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় স্বীকার না করে তাঁদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই এই পরিচয় প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ঐতিহাসিক ও জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করে আসছেন। এই মতপার্থক্য রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বিরোধকে আরও জটিল করেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে ২০১৫ সালের কথিত বৈঠকের অভিযোগ এবং ২০১৭ সালের সহিংসতার মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পাওয়া যায়নি।