তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানার 'বঞ্চিত' হওয়ার দাবি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর: ক্ষতিগ্রস্ত সরকারের তথ্যপ্রচার ও ভাবমূর্তি

বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে ‘বঞ্চিত’ থাকার দাবি করলেও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানার দাপ্তরিক নথিতে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পে দায়িত্ব, বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণ এবং পদোন্নতির নানা তথ্য। ফলে তার ‘বঞ্চিত’ থাকার দাবির সঙ্গে দাপ্তরিক রেকর্ডের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এর পাশাপাশি তার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, অধীন দপ্তর-সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। যে মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও অর্জন জনগণের কাছে তুলে ধরা এবং সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখা, সেই মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার অভিযোগ শেষ পর্যন্ত সরকারের তথ্যপ্রচার ও ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

PostImage

তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানার 'বঞ্চিত' হওয়ার দাবি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর: ক্ষতিগ্রস্ত সরকারের তথ্যপ্রচার ও ভাবমূর্তি


তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব মাহবুবা ফারজানা বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে ‘বঞ্চিত’ বা কোণঠাসা ছিলেন—এমন দাবির সঙ্গে তার দাপ্তরিক নথির তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। তার সার্ভিস রেকর্ড বা পিডিএস (PDS) এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক নথি বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিগত সরকারের প্রায় ১৫ বছরে তিনি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পে কাজ, একাধিক দেশে সরকারি ও প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত পদোন্নতির সুযোগও পেয়েছেন।


দাপ্তরিক নথির তথ্য অনুযায়ী, মাহবুবা ফারজানা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তিন দফায়—২০০৩, ২০১৩ ও ২০২০ সালে—দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অর্থ বিভাগে উপসচিব এবং ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী এসব দপ্তরে একাধিকবার দায়িত্ব পাওয়া তার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ পদায়নেরই ইঙ্গিত দেয়।


বিদেশি প্রকল্পে লিয়েনের সুবিধা:

নথি অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মাহবুবা ফারজানা লিয়েনের সুবিধায় বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প SEIP ও SIIP-এ জেন্ডার স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির বাইরে এ ধরনের প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি সরকারি পদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি বেতনের সুযোগ পান।


সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ধরনের বিশেষ সুবিধা পেতে সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফলে রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিলেন—এমন দাবির সঙ্গে এই সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি সাংঘর্ষিক বলে তারা মনে করছেন।


বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণ:

পিডিএসের তথ্য উদ্ধৃত করে সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দেড় দশকে মাহবুবা ফারজানা সরকারি ও প্রকল্পের অর্থায়নে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভারতসহ অন্তত ১০টি দেশে সফর করেছেন। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় চারবার যাওয়ার তথ্য রয়েছে।


এসব সফরের অধিকাংশই উচ্চতর প্রশিক্ষণ বা সরকারি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও বিদেশ সফরের সুযোগ পাওয়ার বিষয়টিও তার ‘বঞ্চিত’ থাকার দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।


পদোন্নতিতেও দ্রুত অগ্রগতি:

মাহবুবা ফারজানার পদোন্নতির ধারাবাহিকতাতেও দ্রুত অগ্রগতির চিত্র পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নথি অনুযায়ী, তিনি ২০২০ সালের জুনে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পান। 


সুবিধাভোগী’ কর্মকর্তা হওয়ার অভিযোগ:

দাপ্তরিক নথির এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, মাহবুবা ফারজানা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত কর্মকর্তা ছিলেন না। বরং গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, বিদেশি প্রকল্পে দায়িত্ব, বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত পদোন্নতির কারণে তিনি ওই সময় প্রশাসনিকভাবে সুবিধা পাওয়া কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন।


অভিযোগকারীদের আরও দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে বর্তমান সরকারের সময়ও তিনি সচিব পদে বহাল রয়েছেন। চাকরির বাকি সময়ে প্রশাসনিক সুবিধা ধরে রাখার জন্য তার এই অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

তবে তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক দলীয় নথি বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে নেই।


অধীন দপ্তর-সংস্থার সঙ্গে দূরত্বের অভিযোগ:

এদিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সচিবের আচরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিমাতাসুলভ আচরণ, দুর্ব্যবহার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর-সংস্থাগুলোর মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এতে প্রশাসনিক সমন্বয় ও কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।


তথ্য ক্যাডারের পদোন্নতি নিয়ে ক্ষোভ:

সম্প্রতি তথ্য ক্যাডারের শূন্য পদে কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা আহ্বানের দাবি ওঠে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেন।


অভিযোগ রয়েছে, ডিপিসির সভা আহ্বান না করে সচিব বিভিন্ন অজুহাতে বিষয়টি দীর্ঘায়িত করতে থাকেন। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান।


এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে সভা আহ্বানের বিষয়ে সচিব সম্মতি দেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি। কিন্তু পরে ডিজিএফআই, এনএসআই ও পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের তদন্তের কথা বলে আবারও প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ওই পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে অন্য কোনো সার্ভিসে এ ধরনের তদন্তের নজির নেই। দীর্ঘ সময় এভাবে প্রক্রিয়া আটকে থাকার পর অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপরও বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা আর আহ্বান করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা।


এ কারণে ক্যাডারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সচিবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।


সমন্বয়হীনতার অভিযোগ:

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সচিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, প্রশাসনিক আচরণ এবং বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন দপ্তর-সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। এতে মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।


একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক গতি ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে সচিবকে অন্যত্র বদলি করে তার স্থলে একজন সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে পদায়ন করা প্রয়োজন।


তাদের মতে, তথ্য ক্যাডারের পদোন্নতি, মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া হলে দীর্ঘদিনের এসব অসন্তোষের অবসান হতে পারে।


সমন্বয়হীনতায় থমকে যাচ্ছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের প্রচারব্যবস্থা:

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা নিয়ে অভিযোগ শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের তথ্যপ্রচার ও জনসংযোগ কার্যক্রমেও। কারণ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সরকারের নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন কর্মসূচি সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান।


মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, প্রচার এবং গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জনসংযোগ কর্মকর্তা, তথ্য কর্মকর্তা, গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বিভিন্ন অধিদপ্তর, সংস্থা ও সরকারি প্রচারমাধ্যমের কর্মীদের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমেই সরকারের কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়।


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সচিবের সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা এবং জনসংযোগ কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা, অনুমোদন পেতে বিলম্ব, পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।


তাদের ভাষ্য, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাজের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত, নীতি, কর্মসূচি বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও দপ্তর-সংস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক সমন্বয় দরকার। কিন্তু সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হলে একটি তথ্য প্রকাশে বিলম্ব হতে পারে, সরকারি কর্মসূচির প্রচার পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে একই বিষয়ে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য বা তথ্য যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।


জনসংযোগ ব্যবস্থায় প্রভাবের আশঙ্কা:

মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তাদের কাজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম নিয়ে গণমাধ্যমে তথ্য সরবরাহ, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরি, সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ, সরকারি কর্মসূচির প্রচার এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের তথ্য সমন্বয়—এসব কাজ জনসংযোগ কর্মকর্তাদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ।


অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ প্রশাসনিক পর্যায়ের সমন্বয় দুর্বল হলে সরকারি তথ্যপ্রচার ব্যবস্থায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। এর ফলে কোনো সিদ্ধান্তের সঠিক ব্যাখ্যা সময়মতো গণমাধ্যমে না পৌঁছানো, সরকারি বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপিত না হওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির প্রচারে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একটি সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র জনগণের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বা অভ্যন্তরীণ বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শুধু মন্ত্রণালয়ের ওপর নয়, সরকারের সামগ্রিক জনসংযোগ কার্যক্রমের ওপরও পড়তে পারে।


সরকারের অর্জন জনগণের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধা:

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা সরকারি অনুষ্ঠান প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক উদ্যোগ, প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্যোগ মোকাবিলা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য জনস্বার্থমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করাও এ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই, সম্পাদনা এবং যথাযথ মাধ্যমে প্রচার করতে হলে মন্ত্রণালয় ও অধীন সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। এই সমন্বয়ে সমস্যা হলে সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডও যথাসময়ে জনগণের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয় না।


ফলে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগ মাঠে বাস্তবায়িত হলেও তার সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছাতে বিলম্ব হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত তার ব্যাখ্যা ও সরকারি অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।


গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব পড়ার অভিযোগ:

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দেশের গণমাধ্যমের সম্পর্কও সরকারের তথ্যপ্রচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারাই নিয়মিতভাবে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, সরকারি কর্মসূচির তথ্য দেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি অবস্থান গণমাধ্যমকে জানান।


কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা থাকলে গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ে। এতে সাংবাদিকদের তথ্য পেতে বিলম্ব, একই বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তর থেকে ভিন্ন তথ্য পাওয়া অথবা কোনো বিষয়ে সরকারি অবস্থান স্পষ্ট করতে সময় লাগার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।


সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে সরকারের তথ্যপ্রচার ব্যবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা থাকা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় দুর্বল হলে গুজব, ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিপরীতে সরকারি তথ্য দ্রুত পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।


মন্ত্রণালয়ের ভেতরের অসন্তোষের প্রভাব মাঠপর্যায়ে:

মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যদি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক অসন্তোষ, পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, বদলি নিয়ে ক্ষোভ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি থাকে, তাহলে কর্মপরিবেশেও তার প্রভাব পড়ে। এর ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্যোগ নেওয়ার প্রবণতা কমে যেতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা বা নিষ্ক্রিয়তা তৈরি হতে পারে।


তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মতো একটি মন্ত্রণালয়ে এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মত। কারণ, এখানে প্রতিদিন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, প্রচার এবং গণমাধ্যমে উপস্থাপনের কাজ চলে।


কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের পরিবর্তে যদি প্রশাসনিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত মতবিরোধ প্রাধান্য পায়, তাহলে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম ধীর হয়ে যেতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সরকারের সামগ্রিক তথ্য ও জনসংযোগ ব্যবস্থা।


‘তথ্য মন্ত্রণালয়’ সরকারের মুখপাত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ:

প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কার্যত সরকারের সঙ্গে জনগণ ও গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করে। সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত যেমন জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়, তেমনি জনগণের প্রতিক্রিয়া ও গণমাধ্যমে উঠে আসা বিভিন্ন বিষয়ও সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা রয়েছে।


ফলে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী সমন্বয়হীনতা তৈরি হলে এর প্রভাব কেবল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। সরকারের তথ্যপ্রচার, গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা, জনসংযোগ এবং জনসাধারণের কাছে সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা তুলে ধরার পুরো প্রক্রিয়াই এতে দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।


এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম গতিশীল রাখতে সচিবালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্ব, মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর-সংস্থা এবং জনসংযোগ কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পদোন্নতি, বদলি, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।


তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দ্রুত নিরসন না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব সরকারের প্রচার ও জনসংযোগ কার্যক্রমে আরও দৃশ্যমান হতে পারে। আর সেই ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও অর্জন জনগণের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরার সক্ষমতাকেই দুর্বল করতে পারে।


একাধিক সরকারের আমলে বহাল মাহবুবা ফারজানা, সমন্বয়হীনতা ও ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন

অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বর্তমান বিএনপি সরকার পর্যন্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন মাহবুবা ফারজানা।


তবে একাধিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সময়ে একই পদে থাকা এই সচিবকে ঘিরে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সময় মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে। মাহফুজ আলম ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর দায়িত্বের শেষ চার মাসে তাঁকে মন্ত্রণালয়ে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। 


অন্যদিকে, ২০২৬ সালের গণভোটে সচিব মাহবুবা ফারজানা প্রকাশ্যেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। ১৩ জানুয়ারি রাজশাহীতে সরকারি প্রচারণা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসন ঠেকাতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে।


তাঁর এই প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ রয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে মাহবুবা ফারজানা জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়ে কাজ করেছেন এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে জামায়াতঘনিষ্ঠদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিএনপি সমর্থিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর