রিয়াদ বিমানবন্দরে আবারও হামলা, পাকিস্তানি নাগরিক নিহত, আহত ১১ জন
সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে নতুন হামলায় পাকিস্তানি নাগরিক নিহত, আহত ১১ জন; পাঁচ দিনে চতুর্থ হামলায় বাড়ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। রবিবার, ১১ অক্টোবরের এই হামলায় একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হামলায় বিমানবন্দরের স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
গত কয়েক দিনের মধ্যে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলকেন্দ্রগুলোতে একের পর এক হামলার ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রিয়াদের এই বিমানবন্দরেই পাঁচ দিনের মধ্যে চতুর্থবারের মতো হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই দিন দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার খবর নিশ্চিত করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সৌদি সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনাল চার লক্ষ্য করে একটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানে। সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনবিষয়ক জোট জানিয়েছে, আঘাতের পর টার্মিনাল এলাকায় আগুন ধরে যায়। জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ শুরু করেন। তবে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিয়ে সব তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার পর আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিমানবন্দরের স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাচাইয়ের কাজও শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে। বিমানবন্দরের কোন কোন অংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো পাওয়া যায়নি।
এই হামলার মাত্র এক দিন আগে, শনিবার, ১০ অক্টোবর, একই বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় প্রথমে অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর জানানো হয়েছিল। পরে আহতদের একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হলে আগের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৩ জনে পৌঁছায় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়। ফলে শনিবার ও রবিবারের হামলায় হতাহতের ঘটনা আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি।
শনিবারের হামলাটি সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বেসামরিক স্থাপনায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিমানবন্দরে হামলার ফলে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বিমান চলাচল ব্যাহত হয়। আহতদের মধ্যে অনেককে চিকিৎসা দিতে হয়। কিছু আহত ব্যক্তির অবস্থা গুরুতর ছিল বলে আগের প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
শনিবারের হামলার জন্য ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দায় স্বীকার করেছে বলে রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি এক বক্তব্যে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার কথা দাবি করেন। তবে রবিবারের প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্র, হামলার পদ্ধতি এবং দায়ীদের বিষয়ে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি এবং কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা প্রয়োজন।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রবিবার রিয়াদের বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলেও একটি চালকবিহীন উড়োজাহাজ প্রতিহত করার কথা জানানো হয়েছে। এসব ঘটনার পর বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
একই দিনে দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার খবর জানায় সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরটির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা যাচাই চলছিল বলে কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই ঘটনায় কেউ নিহত বা আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
দাম্মাম সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। এর বিমানবন্দর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি দেশটির পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার খবর শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তা নয়, বৃহত্তর যোগাযোগব্যবস্থার ওপরও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন দেশটি ইয়েমেনের সংঘাতে আবারও সরাসরি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সৌদি সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের সরকারের সমর্থক। অন্যদিকে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে এবং দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।
হুতি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর পেছনে ইয়েমেনে সৌদি হামলার কথা উল্লেখ করেছে। তবে কোনো পক্ষের বক্তব্যকে এককভাবে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। হামলার প্রকৃত লক্ষ্য, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র জানতে স্বাধীন তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
বেসামরিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। সশস্ত্র সংঘাতে বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লে তার পরিস্থিতি ও দায় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার আইনগত মূল্যায়ন করতে হলে হামলার প্রকৃতি, লক্ষ্য এবং প্রাপ্ত প্রমাণ বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করতে হয়।
রিয়াদের বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার কারণে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শনিবারের প্রাণঘাতী হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার খবর প্রকাশিত হয়। রবিবার নতুন করে হামলা এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের কারণে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা।
সৌদি আরবে বসবাসরত বিদেশি কর্মী, তাঁদের পরিবার এবং দেশটিতে যাতায়াতকারী যাত্রীদের মধ্যেও এসব ঘটনার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক সৌদি আরবে কাজ করেন। বিমানবন্দর বন্ধ থাকা বা উড়োজাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তাঁদের কর্মস্থলে যাতায়াত, ছুটি শেষে কাজে ফেরা এবং জরুরি ভ্রমণ পরিকল্পনা প্রভাবিত হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বলে সৌদি সরকারি সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সৌদি আরবের প্রতি সংহতি জানান। পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দুই দেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও নিহতের পরিবারের সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সামনে তাৎক্ষণিক কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পরীক্ষা এবং উড়োজাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর আগে প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করা জরুরি। একই সঙ্গে হামলার উৎস শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কার্যকর রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, রিয়াদ বিমানবন্দরে পাকিস্তানি নাগরিকের মৃত্যু ও আরও ১১ জন আহত হওয়ার ঘটনা সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল অবকাঠামোর ওপর চলমান চাপকে স্পষ্ট করেছে। পাঁচ দিনে একই বিমানবন্দরে চারবার হামলার খবর এবং দাম্মামের বিমানবন্দরেও নতুন হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। তবে সর্বশেষ হামলার পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি, সব ঘটনার দায় এবং বিমান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সময় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সৌদি কর্তৃপক্ষের পরবর্তী বিবৃতি ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।





