ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর দৌড়ে হিলটনকে এগিয়ে দেখিয়ে ছড়াল বিভ্রান্তিকর নির্বাচনী দাবি
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে স্টিভ হিলটনের এগিয়ে থাকার দাবি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, সাম্প্রতিক জনমত জরিপে জাভিয়ের বেসেরা এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
Desk Reporter
সিএসবি নিউজ ইউএসএ
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর দৌড়ে হিলটনকে এগিয়ে দেখিয়ে ছড়াল বিভ্রান্তিকর নির্বাচনী দাবি
৭ মিনিটে পড়ুন
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচন ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিতে বলা হচ্ছে, রিপাবলিকান প্রার্থী স্টিভ হিলটন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জাভিয়ের বেসেরার চেয়ে ২৮ শতাংশের বিপরীতে ২৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে, নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক এলাকার ভোটের হিসাব এখনো বাকি। এই বক্তব্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করলেও প্রকাশিত নির্বাচনী তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, দাবিটিতে পুরোনো ফলাফল ও বর্তমান নির্বাচনী পরিস্থিতি গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ার ২০২৬ সালের ২ জুনের প্রাথমিক নির্বাচনে বেসেরা প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। অন্যদিকে হিলটনের ভোট ছিল প্রায় ২৪ দশমিক ৬ থেকে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ ওই নির্বাচনে হিলটন বেসেরার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন না; বরং বেসেরা প্রায় তিন শতাংশের বেশি ব্যবধানে প্রথম অবস্থানে ছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে প্রকাশিত তথ্যেও এই ব্যবধানের প্রমাণ পাওয়া যায়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাথমিক নির্বাচনের ভোটের হিসাব এবং নভেম্বরের চূড়ান্ত নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে জনসমর্থনের হিসাব এক নয়। প্রাথমিক নির্বাচনে একাধিক দলের প্রার্থী একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেখানে ভোটাররা নিজেদের পছন্দের যেকোনো প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। সর্বাধিক ভোট পাওয়া দুই প্রার্থী পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান। ফলে প্রাথমিক নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের হারকে সরাসরি চূড়ান্ত নির্বাচনে তাঁর জয় বা পরাজয়ের সম্ভাবনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। ক্যালিফোর্নিয়ায় এই ব্যবস্থার কারণেই এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাথমিক নির্বাচনে বেসেরা ও হিলটন শীর্ষ দুই অবস্থানে থাকায় তাঁরা নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে মুখোমুখি হচ্ছেন। বেসেরা ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী, আর হিলটন রিপাবলিকান দলের প্রার্থী। ফলে এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি মূলত দুই দলের সমর্থকদের পাশাপাশি দলনিরপেক্ষ ভোটারদের সমর্থন অর্জনের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপের চিত্রও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবির সঙ্গে মেলে না। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টাল স্টাডিজ এবং লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের যৌথভাবে প্রকাশিত আগস্টের এক জরিপে বেসেরা ৫৫ শতাংশ এবং হিলটন ৩৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন। অর্থাৎ ওই জরিপে বেসেরা ১৮ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের জরিপেও বেসেরার শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রকাশিত আরেকটি জরিপে বেসেরার সমর্থন আরও বেশি দেখা যায়। বার্কলে ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টাল স্টাডিজের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনে বেসেরা ও হিলটনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে ভোটারদের পছন্দের হিসাব বেসেরার পক্ষে ছিল। একই সময়ে অন্যান্য জরিপেও বেসেরা এগিয়ে ছিলেন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, নির্বাচনের বর্তমান পর্যায়ে হিলটন বেসেরাকে ছাড়িয়ে গেছেন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
অক্টোবরের ১১ তারিখে হালনাগাদ হওয়া নির্বাচনী জনমত জরিপের সমন্বিত হিসাবেও বেসেরা এগিয়ে ছিলেন। ওই হিসাব অনুযায়ী, বেসেরার সমর্থন ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং হিলটনের সমর্থন ছিল প্রায় ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এই ব্যবধান দেখায় যে, বিভিন্ন জরিপের ফল একত্রে বিবেচনা করলে বেসেরা এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে জনমত জরিপ কখনোই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত করে না। ভোটারদের পছন্দ পরিবর্তন, নির্বাচনে অংশগ্রহণের হার এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক ঘটনাবলি ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাহলে ২৮ শতাংশ বনাম ২৫ শতাংশের সংখ্যাটি কোথা থেকে এসেছে? প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, এই সংখ্যাগুলো জুনের প্রাথমিক নির্বাচনের ফলাফলের কাছাকাছি। কিন্তু সেখানেও বেসেরা প্রায় ২৮ শতাংশ এবং হিলটন প্রায় ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। সংখ্যাগুলোকে উল্টে দিয়ে হিলটন এগিয়ে রয়েছেন বলা হলে তা নির্বাচনী ফলাফলের ভুল উপস্থাপন হবে। মূল দাবিতে কোন জরিপ প্রতিষ্ঠান, কোন তারিখে জরিপ পরিচালনা করেছে, কতজন ভোটারের মতামত নেওয়া হয়েছে কিংবা জরিপের ভুলের সীমা কত—এসব তথ্যও উল্লেখ করা হয়নি। তাই দাবিটিকে বর্তমান জনমতের নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন হিসেবে গ্রহণ করার ভিত্তি নেই।
এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। নির্বাচনের অনেক এলাকার ভোট গণনা বাকি থাকার বক্তব্যটি জুনের প্রাথমিক নির্বাচনের সময় প্রাসঙ্গিক ছিল। সে সময় বিভিন্ন এলাকার ভোট গণনা চলছিল এবং প্রার্থীদের অবস্থান পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের আগে সেই পুরোনো বক্তব্যকে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করলে পাঠক ভুল ধারণা পেতে পারেন। প্রাথমিক নির্বাচনের ভোট গণনা শেষ হওয়া এবং নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে ভোট গণনা শুরু হওয়া দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনা। নির্বাচনী প্রচারে হিলটন যে বিষয়গুলো সামনে আনছেন, তার মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর হ্রাস এবং জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি রাজ্যের করব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় পর্যন্ত রাজ্য আয়কর কমানো এবং উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে কর আরোপ করা। পাশাপাশি তিনি সরকারি ব্যবস্থাপনার কিছু খাতে পরিবর্তন আনার কথাও বলেছেন। এসব প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তিনি এমন ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন, যাঁরা ক্যালিফোর্নিয়ার উচ্চ ব্যয় এবং সরকারি নীতির কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তুষ্ট। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি সহজ নয়। রাজ্যের করব্যবস্থা পরিবর্তন, সরকারি ব্যয় কমানো কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য আইনসভায় সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনসভায় ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী অবস্থান থাকায় হিলটন নির্বাচিত হলেও তাঁর সব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে বেসেরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার এবং বিদ্যমান সরকারি কর্মসূচি রক্ষার বিষয়গুলো সামনে রাখছেন। দুই প্রার্থীর নীতিগত পার্থক্য ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বেসেরার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও এই নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। এর আগে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কংগ্রেসের সদস্যও ছিলেন। তাঁর সমর্থকেরা এই অভিজ্ঞতাকে রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সুবিধা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর অতীত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে বেসেরার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যেমন তাঁর প্রচারের শক্তি, তেমনি তাঁর অতীত রেকর্ডও নির্বাচনী বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
হিলটনের রাজনৈতিক পরিচয়ও নির্বাচনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকানদের প্রধান প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন তাঁর প্রচারে দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছে। তবে এই সমর্থন তাঁর জন্য সুবিধা না অসুবিধা তৈরি করবে, তা নির্ভর করছে ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা জাতীয় রাজনীতিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন তার ওপর। ক্যালিফোর্নিয়া দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। রাজ্যের শহরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন সাধারণত বেশি। বিপরীতে রাজ্যের কিছু অভ্যন্তরীণ ও রক্ষণশীল অঞ্চলে রিপাবলিকানদের অবস্থান শক্তিশালী। এই ভৌগোলিক পার্থক্য নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। হিলটন যদি নিজের দলের সমর্থকদের ভোট নিশ্চিত করার পাশাপাশি দলনিরপেক্ষ ভোটারদের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করতে পারেন, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও কঠিন হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে বেসেরার যে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য হিলটনকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।
ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে বাসস্থান ও ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, জ্বালানি ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান। রাজ্যের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ অনুভব করছেন। ফলে কে এই ব্যয় কমাতে পারবেন, কার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত এবং কোন প্রার্থী রাজ্যের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশি কার্যকর হবেন—এসব প্রশ্ন নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে রয়েছে। দুই প্রার্থীর প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি তাঁদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আর্থিক ও প্রশাসনিক সম্ভাব্যতাও যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো প্রার্থীকে এগিয়ে দেখানো হলে সেই তথ্যের উৎস যাচাই করা জরুরি। একটি জনমত জরিপের ফল নির্ভর করে জরিপের তারিখ, নমুনার আকার, অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় এবং প্রশ্ন করার পদ্ধতির ওপর। শুধু দুটি সংখ্যা প্রকাশ করলেই কোনো প্রার্থীর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বিশেষ করে প্রাথমিক নির্বাচনের ফলাফল এবং সাধারণ নির্বাচনের জরিপ একসঙ্গে মিশিয়ে দিলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।