রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা, ১২ জন নিহত, ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া, ‘এটি ভয়াবহ’
রিয়াদ বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় ১২ জন নিহত, আহত ৩০৯ জন; ট্রাম্প বললেন, ‘এটি ভয়াবহ’, হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
লিখেছেন Desk Reporter- সিএসবি নিউজ ইউএসএ
প্রকাশিত
রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা, ১২ জন নিহত, ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া, ‘এটি ভয়াবহ’
৬৯৪ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অভিযোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে তাঁর নামে প্রচারিত “আমি মনে করি, এটি ভয়াবহ” বক্তব্যটির হুবহু ভাষা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, হামলা, হতাহতের সংখ্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন নাগরিক, বাংলাদেশের দুজন এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক ছিলেন। আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০৯ জনে। তবে হতাহতের পরিচয়সংক্রান্ত প্রাথমিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা দিতে পারে। তাই চূড়ান্ত সরকারি তালিকা প্রকাশিত হলে সেটিই সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। হামলার পরপরই বিমানবন্দর এলাকায় জরুরি উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিস্ফোরণের পর টার্মিনালের ভেতরে একাধিক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। আহতদের হাসপাতালে নিতে বিপুলসংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কয়েকজনকে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্ফোরণের প্রভাবে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিমানবন্দরের মতো জনবহুল স্থানে এমন হামলা যাত্রী, বিমানকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী এবং সেখানে দায়িত্ব পালনরত অন্যান্য কর্মীদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, বিমানবন্দরটিকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার পেছনে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা রয়েছে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বাড়িয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে কোনো হামলার দায়, ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং হামলার সামরিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, প্রমাণ এবং স্বাধীন তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি পক্ষের অভিযোগকে তাই কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করাই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে যথাযথ।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, ১০ অক্টোবরের হামলাটি ওই সপ্তাহে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় হামলা ছিল। এর আগের হামলাগুলোতেও প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছিল। আগের দুটি হামলায় চারজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে থাকা সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারাবাহিক এসব হামলা সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা, বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঘটনার পর রিয়াদগামী সব উড়োজাহাজের চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। এর ফলে যাত্রীদের যাত্রাসূচি, সংযোগকারী ফ্লাইট এবং বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। কয়েকটি বিমান সংস্থা নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সৌদি রাজধানীতে তাদের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য এর অর্থ হলো, টিকিট থাকলেও নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ঘটনাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে এবং সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও ওই সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অভিযানে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে—এমন তথ্য রয়টার্সের প্রতিবেদনে ছিল না।
আপনার দেওয়া তথ্যে ট্রাম্পের “আমি মনে করি, এটি ভয়াবহ” বক্তব্যটি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যাচাই করা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনগুলোতে তাঁর প্রতিক্রিয়ার যে অংশ পাওয়া গেছে, সেখানে মূলত সৌদি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। উদ্ধৃত বাক্যটির হুবহু শব্দচয়ন নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ এই প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। তাই বাক্যটিকে নিশ্চিত সরাসরি উদ্ধৃতি হিসেবে প্রকাশ করার পরিবর্তে বলা নিরাপদ যে, ট্রাম্প হামলার পর সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। সংবাদে উদ্ধৃতির যথার্থতা বজায় রাখা জরুরি, কারণ ভুল উদ্ধৃতি পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে নিরীহ মানুষের জীবনের প্রতি অবজ্ঞার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বেসামরিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা হলে তার প্রভাব কেবল একটি দেশের নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিহত হওয়ায় এই ঘটনার কূটনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এই সংকটের পেছনে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের যুদ্ধে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একটি আরব সামরিক জোটের নেতৃত্ব দেয়। পরবর্তী সময়ে সংঘাত ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। ২০২২ সালে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে সমঝোতা হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়া এবং সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে সংঘাতের বিভিন্ন পক্ষের দাবি ও পাল্টা দাবির সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হামলার সময় সতর্কবার্তা জারি হয়েছিল কি না, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেছে—এসব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর প্রকাশ্যে আসেনি। রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবারের হামলার আগে সৌদি আরবের সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় কোনো সতর্কতা জারি হয়নি বলে ঘটনাটি নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন।
যাত্রীদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যাত্রার আগে নিজ নিজ বিমান সংস্থার কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করা। বিমানবন্দর বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল কিংবা অন্য বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ সরিয়ে নেওয়ার কারণে যাত্রাপথে পরিবর্তন আসতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণকারীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং টিকিট, পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি কাছে রাখা উচিত।
সব মিলিয়ে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হওয়ার ঘটনা সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকট। হামলার দায় নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ হুতিদের অভিযুক্ত করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততা বিবেচনার কথা বলেছেন। তবে ট্রাম্পের নামে প্রচারিত নির্দিষ্ট উদ্ধৃতিটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। হতাহতের সংখ্যা, হামলার দায় এবং পরবর্তী সামরিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে নতুন সরকারি ঘোষণা ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করাই হবে সবচেয়ে দায়িত্বশীল পন্থা।