গ্রিন কার্ড পেতে নতুন বাধা, আয় ও সরকারি সহায়তার হিসাব দেখবে সরকার
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নিয়মে গ্রিন কার্ড আবেদনে মেডিকেড, খাদ্য ও আবাসন সহায়তার ইতিহাসসহ আয়, সম্পদ ও পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আসবে।
গত আঠারো সেপ্টেম্বর থেকে আমেরিকায় স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার নিয়ম বদলে গেছে। এই তারিখ থেকে যারা আমেরিকার ভেতর থেকে সবুজ কার্ডের জন্য আবেদন করছেন, তাদের আবেদন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। এতদিন পর্যন্ত অনেকেই ভাবতেন, পরিবারের কেউ স্পনসর করলেই, ট্যাক্সের কাগজ ঠিক থাকলেই, কোনো বড় অপরাধ না থাকলেই সবুজ কার্ড পাওয়া যাবে। এখন আর সেই সহজ ধারণা চলবে না। নতুন ব্যবস্থায় কর্মকর্তাদের হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা এখন দেখবেন, আবেদনকারী ভবিষ্যতে কখনো সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন কি না। এই সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য তারা আবেদনকারীর পুরো জীবনের ছবি দেখবেন। তার বয়স কত, তার স্বাস্থ্য কেমন, তার পরিবারে কে কে আছেন, তার হাতে কত টাকা আছে, তার শিক্ষা ও কাজের দক্ষতা কেমন, তার স্পনসর কতটা শক্তিশালী, এবং তিনি কখনো সরকারি সুবিধা নিয়েছেন কি না, সবকিছু একসাথে বিবেচনা করা হবে। এই পরিবর্তনটি এসেছে গত বিশ জুলাই চূড়ান্ত নিয়ম প্রকাশের মাধ্যমে। গত ষোল জুলাই স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তর ঘোষণা করে, দুই হাজার বাইশ সালের নিয়ম বাতিল করা হলো। গত আঠারো আগস্ট নাগরিকত্ব ও অভিবাসন দপ্তর কর্মকর্তাদের জন্য নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করে। এই দুটি সিদ্ধান্ত একসাথে গত আঠারো সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
আগে নিয়ম কী ছিল, তা বোঝা জরুরি। দুই হাজার বাইশ সালের নিয়মে কর্মকর্তারা সাধারণত শুধু দুটি বিষয় দেখতেন। একটি হলো নগদ টাকার সহায়তা, যেমন দরিদ্রদের জন্য নগদ সাহায্য বা পরিপূরক আয়। আরেকটি হলো সরকারের টাকায় দীর্ঘদিন হাসপাতাল বা সেবাকেন্দ্রে থাকা। নিয়মিত স্বাস্থ্যবিমা, খাবারের সহায়তা, বাড়ি ভাড়ার সহায়তা, এসব সাধারণত ধরা হতো না। ফলে অনেক পরিবার নিশ্চিন্তে সন্তানের জন্য স্বাস্থ্যবিমা, স্কুলের খাবারের সুবিধা, এসব নিতে পারতেন। এখন সেই ছবি পুরোপুরি বদলে গেছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আয় যাচাই করে দেওয়া যেকোনো সরকারি সুবিধা এখন বিবেচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে আছে স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা, খাবারের কুপন, বাড়ি ভাড়ার ভাউচার, সরকারি বাড়ি, কলেজের আর্থিক সাহায্য, শিশুদের খাবারের সুবিধা, নগদ সাহায্য, আরও অনেক কিছু। এমনকি শুধু সুবিধা পাওয়া নয়, সুবিধার জন্য আবেদন করা বা অনুমোদন পাওয়াও এখন বিবেচনায় আসতে পারে, যদিও শেষ পর্যন্ত টাকা না নিয়ে থাকেন। এই বিষয়টি অনেকের জন্য চমক হয়ে এসেছে। কারণ অনেকে ভাবতেন, আবেদন করলেই তো আর সুবিধা নেওয়া হয় না। নতুন নিয়ম বলছে, আবেদন করাটাও এখন কর্মকর্তার চোখে একটি সংকেত।
তবে এখানে একটি বড় ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে, তা পরিষ্কার করা দরকার। সরকারি সুবিধা নিলেই সবুজ কার্ড বাতিল হয়ে যাবে, এই কথা সত্য নয়। নির্দেশনায় বারবার বলা হয়েছে, কোনো একটি সুবিধা নেওয়া একা বাতিলের কারণ হবে না। কর্মকর্তাকে পুরো পরিস্থিতি দেখতে হবে। যেমন একজন মানুষ যদি অল্প সময়ের জন্য খাবারের সহায়তা নিয়ে থাকেন, কিন্তু তার ভালো চাকরি আছে, ভালো শিক্ষা আছে, শক্তিশালী স্পনসর আছে, তাহলে তিনি এখনো সবুজ কার্ড পেতে পারেন। আবার একজন মানুষ যদি বছরের পর বছর ধরে সব ধরনের সুবিধা নিয়ে থাকেন, তার কোনো চাকরি না থাকে, তার স্পনসরও দুর্বল হন, তাহলে তার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। কর্মকর্তা দেখবেন, সুবিধা কতদিন নেওয়া হয়েছে, কত টাকার নেওয়া হয়েছে, কতদিন আগে নেওয়া হয়েছে এবং কেন নেওয়া হয়েছে। অসুস্থতা, চাকরি হারানো, দুর্ঘটনা, এসব কারণে সুবিধা নেওয়া হলে তা একভাবে দেখা হবে। আর ইচ্ছা করে কাজ না করে সুবিধার ওপর নির্ভর করা হলে তা অন্যভাবে দেখা হবে। এই পার্থক্য বোঝা খুব জরুরি। কারণ এই পার্থক্যের ওপরেই অনেক পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
দুটি তারিখ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথম তারিখ হলো আবেদন জমা দেওয়ার তারিখ। যাদের আবেদন আঠারো সেপ্টেম্বরের আগে ডাকঘরে পাঠানো হয়েছে বা অনলাইনে জমা দেওয়া হয়েছে এবং দপ্তর গ্রহণ করেছে, তাদের আবেদন পুরোনো দুই হাজার বাইশ সালের নিয়মেই যাচাই করা হবে, এমনকি সাক্ষাৎকার অনেক পরে হলেও। আর যাদের আবেদন আঠারো সেপ্টেম্বর বা তার পরে জমা দেওয়া হয়েছে, তাদের আবেদন নতুন কঠিন নিয়মে যাচাই করা হবে। দ্বিতীয় তারিখ হলো সুবিধা নেওয়ার তারিখ। আঠারো সেপ্টেম্বরের আগে নেওয়া সুবিধা পুরোনো সংকীর্ণ নিয়মে দেখা হবে। আঠারো সেপ্টেম্বরের পরে নেওয়া সুবিধা নতুন বিস্তৃত নিয়মে দেখা হবে। অর্থাৎ একই পরিবারের দুই ভাইয়ের আবেদন দুই রকম নিয়মে যাচাই হতে পারে, শুধু জমা দেওয়ার তারিখের কারণে। এই কারণে আইনজীবীরা বারবার বলছেন, আবেদনের তারিখ, ডাকঘরের রসিদ, অনলাইনে জমা দেওয়ার প্রমাণ, সবকিছু যত্ন করে রাখুন।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে আবেদনের ফরম নিয়ে। আঠারো সেপ্টেম্বর থেকে নতুন সংস্করণের ফরম ব্যবহার করতে হবে। পুরোনো সংস্করণের ফরম দিয়ে আবেদন করলে আবেদন সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হবে, কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। গত পাঁচ আগস্ট থেকে আরেকটি নিয়ম চালু হয়েছে, যেখানে অসম্পূর্ণ আবেদন কোনো অতিরিক্ত কাগজ চাওয়া ছাড়াই বাতিল করে দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ এখন ভুল ফরম, ভুল ফি, কাগজ বাদ পড়া, এসব ছোট ভুলও বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। অনেকেই নিজে নিজে আবেদন করেন। তারা যদি না জানেন, কোন সংস্করণের ফরম চলছে, তাহলে তাদের মাসের পর মাস অপেক্ষা এক মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই কারণে আবেদন করার আগে দপ্তরের ওয়েবসাইটে ফরমের সংস্করণের তারিখ মিলিয়ে দেখা এখন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে।
কে কে এই নতুন নিয়মের বাইরে থাকবেন, তা জানাও জরুরি। এই নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী, মানবপাচারের শিকার, অপরাধের শিকার, পারিবারিক সহিংসতার শিকার যারা নিজে আবেদন করেছেন, বিশেষ অভিবাসী কিশোর, সাময়িক সুরক্ষা পাওয়া মানুষ, আফগান ও ইরাকি যারা সরকারের হয়ে কাজ করেছেন, কিউবা ও হাইতির বিশেষ প্রবেশকারী, এসব শ্রেণির মানুষ এই নিয়মের বাইরে। তারা এই পরীক্ষার মুখোমুখি হবেন না। কিন্তু পরিবারের মাধ্যমে, কাজের মাধ্যমে, বিনিয়োগের মাধ্যমে, লটারির মাধ্যমে যারা সবুজ কার্ডের জন্য আবেদন করছেন, তারা সবাই এই নিয়মের আওতায় পড়বেন। এমনকি কাজের মাধ্যমে আবেদন করা উচ্চ দক্ষতার মানুষ, যাদের কোনো চাকরির প্রস্তাব লাগে না, তারাও এই নিয়মের আওতায় পড়বেন। কর্মকর্তা এখন তাদের কাছেও চাকরির প্রস্তাব, ভবিষ্যৎ বেতনের প্রমাণ, সঞ্চয়ের প্রমাণ চাইতে পারেন। এই বিষয়টি অনেক স্বনিয়োজিত আবেদনকারীকে বিপাকে ফেলেছে। কারণ তাদের পক্ষে আগে থেকে চাকরির প্রস্তাব দেখানো সম্ভব নয়।
পরিবারের সুবিধা নিয়েও অনেক বিভ্রান্তি আছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যের নেওয়া সুবিধাকে সরাসরি আবেদনকারীর নেওয়া সুবিধা হিসেবে ধরা হবে না। যেমন আমেরিকার নাগরিক সন্তানের স্বাস্থ্যবিমা আবেদনকারীর নিজের সুবিধা নয়। সন্তানের জন্য আবেদন করার কারণে বাবা বা মাকে সুবিধা নেওয়া মানুষ হিসেবে ধরা হবে না। কিন্তু কর্মকর্তা পরিবারের পুরো আর্থিক ছবি দেখার সময় পরিবারের সদস্যদের সুবিধা নেওয়াকে পরোক্ষভাবে বিবেচনা করতে পারেন। যেমন পরিবারে যদি সবাই সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হন, তাহলে পরিবারের আর্থিক অবস্থা দুর্বল বলে মনে হতে পারে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা কঠিন। এই কারণে অনেক পরিবার ভয়ে সন্তানের বৈধ সুবিধাও বাতিল করে দিচ্ছেন। আইনজীবীরা বলছেন, ভয়ে সন্তানের সুবিধা বাতিল করা ঠিক নয়। কারণ সন্তানের সুবিধা বাতিল করলেও বাবা-মায়ের আয়, চাকরি, স্পনসর, ট্যাক্সের কাগজ বদলাবে না। বরং সন্তানের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। সুবিধা নেওয়া বন্ধ করলেই যে সবুজ কার্ড নিশ্চিত হবে, এমন কোনো কথা নেই।
এই নতুন নিয়মের সাথে আরেকটি বড় পরিবর্তন একসাথে এসেছে, যা লাখ লাখ মানুষকে আরও বেশি চিন্তায় ফেলেছে। সেটি হলো আমেরিকার ভেতর থেকে সবুজ কার্ডের আবেদন, যাকে বলা হয় মর্যাদা পরিবর্তনের আবেদন, তা এখন কঠিন করে দেওয়া। গত একুশ মে প্রকাশিত আরেকটি স্মারকে বলা হয়েছে, আমেরিকার ভেতর থেকে সবুজ কার্ডের আবেদন এখন শুধু অসাধারণ পরিস্থিতিতেই দেওয়া হবে। সাধারণ নিয়ম হবে নিজ দেশে গিয়ে দূতাবাসের মাধ্যমে ভিসা নিয়ে আসা। এই নীতি প্রায় সাত লাখ থেকে দশ লাখ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ চল্লিশ হাজার পরিবারের মাধ্যমে আবেদনকারী এবং প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার কাজের মাধ্যমে আবেদনকারী আছেন। যারা ইতোমধ্যে আবেদন জমা দিয়ে অপেক্ষা করছেন, তাদেরও এখন অতিরিক্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কর্মকর্তারা জিজ্ঞেস করছেন, আপনি কেন আমেরিকার ভেতর থেকে আবেদন করলেন, কেন নিজ দেশে গিয়ে আবেদন করলেন না। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অনেকের জন্য কঠিন। কারণ তাদের চাকরি, সন্তানের স্কুল, বাড়ি, সবকিছু আমেরিকায়। দেশে গিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তার ওপর অনেক দেশে দূতাবাসে সাক্ষাৎকারের দীর্ঘ অপেক্ষা আছে। কিছু দেশে অভিবাসী ভিসার প্রক্রিয়া বন্ধ আছে। কিছু দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আছে। ফলে দেশে গিয়ে আবেদন করা মানে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, চাকরি হারানো, এমনকি তিন বছর বা দশ বছরের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি। আইনজীবীরা সতর্ক করেছেন, দেশ ছাড়ার আগে অবশ্যই আইনি পরামর্শ নিতে হবে। কারণ একবার দেশ ছাড়লে ফিরে আসা অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।
তাহলে এখন সাধারণ মানুষ কী করবেন। বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রথমত, আবেদন করার আগে নিজের শ্রেণি যাচাই করুন। আপনি এই নিয়মের আওতায় পড়েন কি না, তা আগে জানুন। দ্বিতীয়ত, আবেদনের তারিখ ও সুবিধা নেওয়ার তারিখ আলাদা করে লিখে রাখুন। তৃতীয়ত, স্পনসরের আর্থিক কাগজ শক্তিশালী করুন। স্পনসরকে দেখাতে হবে, তিনি দারিদ্র্যসীমার একশ পঁচিশ শতাংশের বেশি আয় করেন এবং তিনি সাহায্য করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম। চতুর্থত, নিজের আয়, সঞ্চয়, ঋণ, ট্যাক্স, চাকরির চিঠি, শিক্ষার সনদ, সবকিছু গুছিয়ে রাখুন। পঞ্চমত, সুবিধা নেওয়া নিয়ে ভয়ে কোনো মিথ্যা তথ্য দেবেন না। মিথ্যা তথ্য ধরা পড়লে তা প্রতারণা হিসেবে ধরা হবে, যা সুবিধা নেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। ষষ্ঠত, যদি কোনো সুবিধা নেওয়া বন্ধ করতে চান, তাহলে আগে আইনজীবীর সাথে কথা বলুন। সুবিধা বন্ধ করলেই সব সমস্যা মিটে যাবে না, বরং পরিবারের ক্ষতি হতে পারে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।