যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব পেতে এবার আর্থিক আচরণও খতিয়ে দেখবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব আবেদনে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে পারিবারিক দায়িত্ব, সরকারি সুবিধা গ্রহণের নিয়ম, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং স্পনসরশিপের প্রতিশ্রুতি।
গত চার নভেম্বর আমেরিকার নাগরিকত্ব ও অভিবাসন দপ্তর থেকে একটি নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশনার কারণে স্থায়ী বাসিন্দা থেকে নাগরিক হওয়ার পথ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে। এতদিন পর্যন্ত অনেকেই মনে করতেন, পাঁচ বছর স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে থাকলেই, ট্যাক্স ঠিকমতো দিলেই, কোনো বড় অপরাধ না করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে। এখন আর সেই ধারণা চলবে না। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একজন আবেদনকারী ভালো নৈতিক চরিত্রের মানুষ কি না, তা যাচাই করার সময় শুধু তার অপরাধের ইতিহাস দেখলেই হবে না। তার টাকাপয়সার আচরণ, তার সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন, তার স্পনসরশিপের প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং সরকারি সুবিধা নেওয়ার ধরন, সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে হবে। এই পরিবর্তনটি সাত পৃষ্ঠার একটি স্মারকের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। স্মারকটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোন কোন আচরণ দেখলে একজন কর্মকর্তা আবেদনকারীকে ভালো নৈতিক চরিত্রের মানুষ হিসেবে মানতে পারবেন না। এই স্মারকটি এখন থেকে নাগরিকত্বের আবেদনের সব মামলায় প্রযোজ্য হবে। এর ফলে লাখ লাখ স্থায়ী বাসিন্দা নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিশেষ করে যারা পরিবারকে স্পনসর করেছেন, যারা কখনো সরকারি সুবিধা নিয়েছেন, যাদের সন্তানের ভরণপোষণ নিয়ে কোনো জটিলতা আছে, তারা এখন সবচেয়ে বেশি চিন্তায় আছেন।
নতুন নির্দেশনায় মোট ছয় ধরনের আচরণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হলো ইচ্ছা করে সন্তান বা নির্ভরশীলদের ভরণপোষণ না দেওয়া। এখানে শুধু আদালতের আদেশ থাকলেই নয়, আদেশ না থাকলেও যদি কেউ ইচ্ছা করে তার সন্তানকে টাকা না দেন, তাহলে তাকে ভালো চরিত্রের মানুষ হিসেবে ধরা হবে না। অনেক প্রবাসী পরিবারে দেখা যায়, বিচ্ছেদের পর বাবা বা মা সন্তানকে নিয়মিত টাকা পাঠান না। কেউ কেউ মনে করেন, আদালতের কাগজ না থাকলে কোনো সমস্যা হবে না। নতুন নিয়মে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হবে। কর্মকর্তারা এখন জিজ্ঞেস করতে পারবেন, আপনি আপনার সন্তানকে গত পাঁচ বছরে কত টাকা দিয়েছেন, তার প্রমাণ কোথায়। ব্যাংকের হিসাব, টাকা পাঠানোর রসিদ, আদালতের কাগজ, সবকিছু দেখাতে হতে পারে। যদি কেউ এই প্রমাণ দিতে না পারেন, তাহলে তার আবেদন আটকে যেতে পারে। এমনকি সন্তান যদি সরকারি সুবিধা নিয়ে বড় হয়ে থাকে, আর বাবা বা মায়ের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি সন্তানকে সাহায্য করেননি, তাহলে সেটিকেও নেতিবাচক হিসেবে ধরা হবে। এই বিষয়টি অনেক পরিবারের জন্য খুব স্পর্শকাতর। কারণ অনেক সময় সন্তানের মা বা বাবা বিদেশে থাকেন, যোগাযোগ কম থাকে, টাকা পাঠানোর হিসাব রাখা হয় না। এখন থেকে এই হিসাব রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে গেল।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সরকারি সুবিধা নিতে প্রতারণা করা। কেউ যদি আয় কম দেখিয়ে, পরিবারের সদস্য সংখ্যা ভুল দেখিয়ে, বাড়ির ঠিকানা গোপন করে, চাকরির তথ্য লুকিয়ে সরকারি সুবিধা নিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি ভালো চরিত্রের বিরুদ্ধে যাবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। প্রতারণার জন্য অপরাধের মামলা বা শাস্তি হওয়া জরুরি নয়। কর্মকর্তা যদি মনে করেন, আবেদনকারী মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, তাহলেই তিনি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। যেমন কেউ যদি খাবারের সহায়তা পাওয়ার জন্য আয় কম দেখান, কিন্তু বাস্তবে তিনি বেশি আয় করেন, তাহলে সেটি ধরা পড়লে তার নাগরিকত্ব আটকে যাবে। একইভাবে কেউ যদি চাকরি পরিবর্তনের তথ্য না জানিয়ে সুবিধা নিতে থাকেন, তাহলেও সমস্যা হবে। অনেকেই ভাবেন, ছোটখাটো ভুলে কিছু হবে না। নতুন নির্দেশনা বলছে, ছোট ভুলও এখন বড় হয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরের ভেতরে এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তা সরাসরি আবেদনের ওপর প্রভাব ফেলবে। এমনকি পাঁচ বছরের আগের ঘটনাও দেখা হতে পারে, যদি কর্মকর্তা মনে করেন, আবেদনকারীর চরিত্র এখনো বদলায়নি।
তৃতীয় এবং চতুর্থ বিষয়টি স্পনসরশিপ নিয়ে। আমেরিকায় পরিবারের কাউকে আনতে গেলে স্পনসরকে একটি অঙ্গীকারপত্রে সই করতে হয়। এই অঙ্গীকারপত্রে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, যাকে আনছেন, তাকে তিনি আর্থিকভাবে সাহায্য করবেন, যাতে তাকে সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভর করতে না হয়। এই প্রতিশ্রুতি সাধারণত দশ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে, অথবা যাকে আনা হয়েছে তিনি নাগরিক না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকে। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, স্পনসর যদি নিজেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন, তাহলে কর্মকর্তা দেখবেন, তিনি তার স্পনসরশিপের প্রতিশ্রুতি রেখেছেন কি না। যাকে তিনি এনেছেন, তিনি যদি সরকারি সুবিধা নিয়ে থাকেন, আর স্পনসর তাকে সাহায্য না করে থাকেন, তাহলে সেটি স্পনসরের চরিত্রের বিরুদ্ধে যাবে। একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে যারা ইউক্রেন, আফগানিস্তান বা অন্য দেশ থেকে মানুষকে আনার জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রেও। অনেকে আবেগে, মানবিক কারণে কাগজে সই করেছিলেন, কিন্তু পরে আর যোগাযোগ রাখেননি, টাকা দেননি। এখন সেই সইয়ের দায় তাদের নাগরিকত্বের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আইনজীবীরা বলছেন, স্পনসরশিপের কাগজ শুধু একটি ফরম নয়, এটি সরকারের সাথে একটি আইনি চুক্তি। এই চুক্তি ভাঙলে সরকার চাইলে স্পনসরের কাছ থেকে টাকা ফেরতও চাইতে পারে।
পঞ্চম বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে। সেটি হলো ইচ্ছা করে স্বাবলম্বী না হয়ে সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভর করা। নতুন নির্দেশনায় একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। একজন মানুষ যদি ইচ্ছা করে কাজ কমিয়ে দেন বা কাজ ছেড়ে দেন, শুধু যাতে খাবারের সহায়তা বা বাড়ি ভাড়ার সহায়তা পাওয়া চালু থাকে, তাহলে সেটিকে নেতিবাচক হিসেবে ধরা হবে। এখানে মানদণ্ড হলো সাধারণ মানুষ কী মনে করবে। সমাজের একজন সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন, এই মানুষটি ইচ্ছা করে কাজ এড়িয়ে সুবিধা নিচ্ছে, তাহলে কর্মকর্তাও সেভাবেই দেখবেন। তবে এই বিষয়টি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেকেই ভাবছেন, সরকারি সুবিধা নিলেই কি নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে না। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। নির্দেশনায় বারবার বলা হয়েছে, বৈধভাবে সরকারি সুবিধা নেওয়া একা নাগরিকত্ব বাতিলের কারণ নয়। দারিদ্র্য, অসুস্থতা, চাকরি হারানো, দুর্ঘটনা, এসব কারণে যদি কেউ সুবিধা নিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি তার বিরুদ্ধে যাবে না। কর্মকর্তাকে প্রতিটি মামলা আলাদাভাবে দেখতে হবে। কেন সুবিধা নেওয়া হয়েছিল, আবেদনকারী নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য কী চেষ্টা করেছেন, পরে তিনি নিজেকে শুধরে নিয়েছেন কি না, সবকিছু বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ শুধু সুবিধা নেওয়া নয়, সুবিধা নেওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য দেখা হবে।
ষষ্ঠ বিষয়টি হলো নির্ভরশীলদের সুবিধা নেওয়া। যদি কোনো আবেদনকারীর সন্তান সরকারি সুবিধা নিয়ে থাকে, তাহলে কর্মকর্তা দেখবেন, আবেদনকারী কেন তার সন্তানকে সাহায্য করতে পারেননি। যদি আবেদনকারীর সামর্থ্য ছিল, কিন্তু তিনি ইচ্ছা করে সাহায্য করেননি, তাহলে সেটিও তার চরিত্রের বিরুদ্ধে যাবে। কিন্তু সন্তান যদি নিজের যোগ্যতায় সুবিধা পেয়ে থাকে, অথবা বাবা-মায়ের আর্থিক সংকটের কারণে সুবিধা নিতে বাধ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটি আবেদনকারীর দোষ হিসেবে ধরা হবে না। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বোঝা খুব জরুরি। কারণ একই ঘটনা একজনের জন্য সমস্যা হতে পারে, আরেকজনের জন্য নাও হতে পারে।
এই নতুন নির্দেশনা কেন এলো, তা বোঝার জন্য গত বছরের পরিবর্তনগুলো দেখতে হবে। গত বছর আগস্ট মাসে আরেকটি নির্দেশনা দিয়ে ভালো নৈতিক চরিত্র যাচাইয়ের পদ্ধতি বদলে দেওয়া হয়েছিল। আগে একটি তালিকা ধরে দেখা হতো, কোনো নিষিদ্ধ কাজ করেছেন কি না। এখন বলা হচ্ছে, পুরো জীবনের পরিস্থিতি দেখতে হবে। ভালো কাজ ও খারাপ কাজ, দুটোই একসাথে ওজন করতে হবে। ট্যাক্স দেওয়া, সমাজসেবা করা, চাকরিতে স্থিতিশীল থাকা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা, এসব ভালো কাজ হিসেবে ধরা হবে। আর মদ্যপান করে গাড়ি চালানো, কর ফাঁকি দেওয়া, সন্তানের ভরণপোষণ না দেওয়া, প্রতারণা করা, এসব খারাপ কাজ হিসেবে ধরা হবে। নতুন নভেম্বরের নির্দেশনা সেই পদ্ধতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। এখন আর্থিক আচরণকে সরাসরি চরিত্রের অংশ বানিয়ে দেওয়া হলো।
এখন প্রশ্ন হলো, যারা ইতোমধ্যে আবেদন করেছেন বা শিগগিরই আবেদন করবেন, তারা কী করবেন। আইনজীবীরা কয়েকটি পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রথমত, আবেদন করার আগে নিজের গত পাঁচ বছরের ইতিহাস নিজে যাচাই করুন। আপনি কাউকে স্পনসর করেছেন কি না, তার কী অবস্থা, আপনি কোনো সরকারি সুবিধা নিয়েছেন কি না, সন্তানের ভরণপোষণের কাগজ ঠিক আছে কি না, এসব দেখুন। দ্বিতীয়ত, সব কাগজ গুছিয়ে রাখুন। সন্তানের ভরণপোষণের রসিদ, ট্যাক্সের কাগজ, স্পনসরশিপের চুক্তি, সরকারি সুবিধার চিঠি, সবকিছু এক জায়গায় রাখুন। সাক্ষাৎকারে কর্মকর্তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্ন করবেন। তৃতীয়ত, যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তাহলে তা লুকাবেন না। আইনজীবীর সাহায্য নিয়ে সত্য কথা বলুন এবং নিজেকে শুধরে নেওয়ার প্রমাণ দিন। যেমন বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধ করা, ট্যাক্সের বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া, স্পনসর করা মানুষকে সাহায্য করা শুরু করা। চতুর্থত, নতুন নাগরিকত্বের আবেদন ফরম আসার আগেই প্রস্তুত থাকুন। দপ্তর বলেছে, তারা ফরম পরিবর্তন করবে এবং সেখানে সরকারি সুবিধা ও নির্ভরশীলদের সাহায্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন যোগ করবে। সেই ফরম আসার তারিখ এখনো জানানো হয়নি। কিন্তু স্মারকটি এখনই কার্যকর। অর্থাৎ নতুন ফরম না আসা পর্যন্ত পুরোনো ফরমে আবেদন করলেও কর্মকর্তা নতুন নিয়মেই যাচাই করবেন।
এই পরিবর্তনের সমালোচনাও হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই নিয়ম গরিব মানুষদের বেশি ক্ষতি করবে। যারা ইংরেজি কম জানেন, যারা আইন কম বোঝেন, তারা হয়তো না বুঝে ভুল করবেন এবং পরে তার শাস্তি পাবেন। অনেকে বলছেন, ভালো চরিত্রের সংজ্ঞা এখন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মতের ওপর বেশি নির্ভর করবে। একজন কর্মকর্তা একভাবে দেখবেন, আরেকজন আরেকভাবে দেখবেন। এতে বৈষম্য বাড়তে পারে। তবে দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিটি মামলা আলাদাভাবে দেখা হবে এবং শুধু দারিদ্র্যের কারণে কাউকে বঞ্চিত করা হবে না।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।