ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধ ভুলে নিউইয়র্কের মানুষের স্বার্থে কাজ করছেন মেয়র মামদানি
রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিউইয়র্কের মানুষের জন্য বন্দিমুক্তি, শোকাহত মায়ের ভিসা ও আবাসন প্রকল্পে অগ্রগতি দাবি মামদানির।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ও নীতিগত মতপার্থক্য অনেক থাকলেও দুজনের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ রয়েছে। এই যোগাযোগের মাধ্যমে নিউইয়র্কের মানুষের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কটি ফলপ্রসূ। রাজনৈতিক অবস্থান আলাদা হলেও নিউইয়র্ক শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনের মধ্যে একটি অভিন্ন আগ্রহ রয়েছে।
৮ নভেম্বর ২০২৬, রোববার প্রচারিত ফক্স নিউজের সাপ্তাহিক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে সাংবাদিক শ্যানন ব্রিমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মামদানি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেন একজন ডেমোক্র্যাটিক সমাজতান্ত্রিক মেয়র হয়েও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছেন।
মামদানির বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার ফলে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিবাসন বিভাগের হেফাজত থেকে নিউইয়র্কের একজন বাসিন্দার মুক্তি, গুলিতে নিহত এক কিশোরের শোকাহত মায়ের যুক্তরাষ্ট্রে আসার জন্য ভিসার ব্যবস্থা এবং কুইন্স এলাকায় বড় আবাসন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ।
সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মামদানির এসব বক্তব্যের পেছনে নির্দিষ্ট ঘটনা রয়েছে। তবে প্রতিটি উদ্যোগের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রে আলোচনা ও পরিকল্পনার অগ্রগতি মানেই নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যাওয়া নয়।
এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুই নেতার মধ্যে অতীতে বেশ তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ ছিল। মামদানি ডেমোক্র্যাটিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, সরকারি সেবা সম্প্রসারণ ও ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপের মতো বিষয় রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের নেতা এবং তাঁর প্রশাসনের অভিবাসননীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মামদানির বেশ কয়েকটি অবস্থানের সরাসরি বিরোধ রয়েছে।
মামদানি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে ট্রাম্প তাঁকে কমিউনিস্ট আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। মামদানিও ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প তাঁকে নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছিলেন এবং নিউইয়র্কের জন্য তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর দুই নেতার সম্পর্কের চিত্র অনেকটাই বদলে যায়।
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর হোয়াইট হাউসে তাঁদের প্রথম বহুল আলোচিত বৈঠক হয়। সেখানে দুই নেতা সরাসরি আলোচনা করেন এবং নিউইয়র্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বৈঠকের পর ট্রাম্প মামদানির প্রশংসা করেন এবং বলেন, তাঁর কিছু ধারণার সঙ্গে নিজের চিন্তার মিল রয়েছে। দুই নেতার আগের রাজনৈতিক বক্তব্যের তুলনায় এই বৈঠকের পরিবেশ ছিল বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ।
রপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁদের আবার হোয়াইট হাউসে বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে নিউইয়র্কের আবাসন সংকট, নতুন বাড়ি নির্মাণ এবং অভিবাসন বিভাগের হাতে আটক ব্যক্তিদের বিষয় উঠে আসে। মামদানি তখন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলমিনা আগায়েভার মুক্তির বিষয়টি ট্রাম্পের কাছে তুলে ধরেন।
আগায়েভাকে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা আটক করেছিলেন। মামদানির অনুরোধের পর ট্রাম্প তাঁকে মুক্তি দেওয়ার কথা জানান বলে তাঁর সহযোগীরা দাবি করেন। পরে সংশ্লিষ্ট ফেডারেল কর্তৃপক্ষ তাঁর মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে। তবে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে অভিবাসনসংক্রান্ত বহিষ্কার কার্যক্রম চলতে পারে বলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল। অর্থাৎ আটক থেকে মুক্তি পাওয়া এবং অভিবাসন মামলার সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি এক বিষয় নয়।
এই ঘটনাকে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার একটি বাস্তব ফল হিসেবে দেখছেন মামদানি। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে সেই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
আরেকটি আলোচিত ঘটনা ব্রঙ্কসে ১৫ বছর বয়সী কিশোর জাভিতস ফ্রিমপংয়ের মৃত্যু। ঘানার নাগরিক এই কিশোর যুক্তরাষ্ট্রে বাবার সঙ্গে বসবাস করছিল। ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে স্কুলে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। নিউইয়র্কের পুলিশ জানিয়েছিল, তাকে পেটে গুলি করা হয়েছিল এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনার পর কিশোরটির মা ডরিস আদু জিয়ামফির ঘানা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে ছেলের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। ছেলের মৃত্যুর সময় মা হাজার হাজার মাইল দূরে থাকায় পরিবারের মধ্যে গভীর শোক তৈরি হয়।
৩১ অক্টোবর নিউইয়র্কের মেয়রের দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মামদানি জানান, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং প্রেসিডেন্ট কিশোরটির মায়ের জন্য দ্রুত ভিসা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। মামদানি বলেন, কোনো মায়ের জন্য সন্তানের মৃত্যু এমনিতেই অসহনীয় কষ্টের, তার ওপর দূরদেশে বসে সেই শোক সহ্য করা আরও কঠিন।
২ নভেম্বর ফক্স নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে আসে। ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুদজেতো আবলাকওয়া মামদানি ও ট্রাম্পের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তিনি জানান, ঘানা সরকার ওই মায়ের ভ্রমণের খরচ বহন করবে এবং মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্যের আয়োজনেও সহায়তা করতে প্রস্তুত। এই ঘটনায় ট্রাম্পের সম্মতি ও মামদানির উদ্যোগের বিষয়টি একাধিক সূত্রে সমর্থিত। তবে ভিসা দেওয়ার সম্মতি এবং ভিসা হাতে পাওয়ার বিষয় দুটি আলাদা; প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
দুই নেতার সম্পর্কের আরেকটি বড় ক্ষেত্র নিউইয়র্কের আবাসন সংকট। মামদানি মনে করেন, শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে বাড়ি পাওয়া। বাড়িভাড়া, বাসস্থান সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করছে। এ সমস্যা সমাধানে কুইন্সের সানিসাইড ইয়ার্ডস এলাকায় বড় আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সহযোগিতা চাইছেন।
সানিসাইড ইয়ার্ডস মূলত রেললাইনের ইয়ার্ড হিসেবে ব্যবহৃত একটি বড় এলাকা। সেখানে নতুন আবাসন, অবকাঠামো এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মামদানির প্রস্তাবে প্রায় ১২ হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণের সুযোগের কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নিউইয়র্কের আবাসন সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তাঁর প্রশাসন মনে করছে।
এই প্রকল্পের জন্য মামদানি ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির বৈঠক এবং সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কের গ্রেসি ম্যানশনে অনুষ্ঠিত পরবর্তী আলোচনাতেও আবাসন পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয়।
সেপ্টেম্বরের বৈঠকে দুই নেতা শুধু আবাসন নয়, অভিবাসননীতি ও শহরের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও আলোচনা করেন। ট্রাম্প নিউইয়র্কে গিয়ে মামদানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তাঁদের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কুইন্সের উন্নয়ন পরিকল্পনা। দুই পক্ষ আবাসন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নিয়ে আরও সমন্বয়ের আগ্রহ দেখায়।
তবে এই প্রকল্প নিয়ে এখনো সতর্ক থাকার কারণ রয়েছে। ১২ হাজার বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা থাকা মানেই বাড়িগুলো নির্মিত হচ্ছে বা ফেডারেল সরকার ২১ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন করেছে, এমন নয়। জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, পরিবহন অবকাঠামো, পরিবেশগত যাচাই, অনুমোদন এবং নির্মাণের সময়সীমা—সবকিছুই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মামদানির সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনা ইতিবাচক হলেও চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব সিদ্ধান্ত ও অর্থ বরাদ্দের ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।