কংগ্রেসের দুই কক্ষ হারিয়ে চাপে ট্রাম্প, আটকে যেতে পারে অভিবাসন ও বাজেটের বড় সিদ্ধান্ত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসের দুই কক্ষের দায়িত্ব নেবে ডেমোক্র্যাটরা।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল দেশটির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় আগামী দুই বছর হোয়াইট হাউসের সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। নতুন পরিস্থিতিতে অভিবাসন, সরকারি ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, করনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। ফলে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে তৈরি হবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। তবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই ক্ষমতার পরিবর্তন কার্যকর হচ্ছে না। নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগপর্যন্ত বর্তমান রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসই দায়িত্ব পালন করবে।
নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসতে পারে অভিবাসননীতি। ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কার, আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা প্রশ্ন তুলতে পারে। এসব বিষয়ে কংগ্রেসে শুনানি আয়োজন, সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং প্রশাসনের ব্যয়ের হিসাব চাওয়ার সুযোগ পাবে বিরোধী দল।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁরা আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, যাঁদের অভিবাসনসংক্রান্ত মামলা চলমান কিংবা যাঁরা পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, তাঁদের জন্য অভিবাসননীতির ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেই গ্রিন কার্ড, নাগরিকত্ব, আশ্রয় বা নির্বাসনসংক্রান্ত নিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে না। এসব পরিবর্তনের জন্য আইন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অথবা আদালতের আদেশ প্রয়োজন হতে পারে।
সরকারি বাজেট নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি দপ্তর, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে চাইবে।
১১ ডিসেম্বর ২০২৬ বর্তমান অস্থায়ী সরকারি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা। এর আগে নতুন অর্থায়ন নিয়ে সমঝোতা না হলে সরকারি কার্যক্রমে অর্থসংকট এবং আংশিক অচলাবস্থার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে নির্বাচনের পরপরই বাজেট নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে দর-কষাকষি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও বাড়িভাড়ার ব্যয় নিয়েও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যবিমা, চিকিৎসা ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও করসংক্রান্ত পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চাইবে। এসব বিষয়ে দুই পক্ষ একমত না হলে নতুন আইন পাসে বিলম্ব হতে পারে।
কংগ্রেসের কমিটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব পেলে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয়, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে তদন্ত ও শুনানি আয়োজন করতে পারবে। প্রয়োজনে সরকারি কর্মকর্তাদের হাজির হতে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জমা দিতে বলা হতে পারে। তবে তদন্ত বা অভিযোগের অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধ করেছেন; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে যথাযথ প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
নতুন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়নের পথও কিছুটা কঠিন হতে পারে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। প্রেসিডেন্ট কোনো বিলে ভেটো দিলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন ছাড়া সেই ভেটো অতিক্রম করা সম্ভব নয়। ফলে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সব সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না।
সিনেটের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষমতাও নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও ফেডারেল বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে নতুন সিনেট প্রশাসনের মনোনীত ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও নীতিগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে। তবে এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধান ও সিনেটের প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
বিদেশনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়েও ওয়াশিংটনে বিতর্ক বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত শুল্ক, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ের মতো বিষয়ে কংগ্রেসের সদস্যরা প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। কংগ্রেস আইন প্রণয়ন, অর্থ বরাদ্দ ও তদারকির মাধ্যমে এসব বিষয়ে প্রভাব রাখতে পারে।
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের হাতে থাকলেও কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন ও প্রশাসনিক তদারকিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। এতে অভিবাসন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি ও সরকারি ব্যয়—বিভিন্ন বিষয়ে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা ও মতবিরোধ দুটিই বাড়তে পারে। আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এই ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।