ট্রাম্পের অভিবাসননীতি নিয়ে তদন্তে নামছে ডেমোক্র্যাটরা, বাড়ছে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ
মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের পর অভিবাসন অভিযান, আটককেন্দ্র, অর্থ ব্যয় ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতিকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাফল্যের পর কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে অভিবাসন কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক তদন্ত, শুনানি ও নজরদারি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান, আটককেন্দ্রের পরিবেশ, অভিবাসীদের সঙ্গে আচরণ, আইন প্রয়োগের পদ্ধতি এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার তদন্তের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
৫ নভেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে চান। অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা সংস্থার কার্যক্রম তাদের তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ডেমোক্র্যাটদের সামনে নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁরা সরকারি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ, নথিপত্র তলব, শুনানি আয়োজন এবং প্রয়োজন হলে তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবেন।
এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন প্রতিনিধি বেনি থম্পসন। মিসিসিপির এই ডেমোক্র্যাট নেতা প্রতিনিধি পরিষদের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির নেতৃত্ব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।
থম্পসন জানিয়েছেন, আগামী কংগ্রেসে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিবাসন নীতির নামে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থের অনিয়ম এবং প্রশাসনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত করা হবে।
তিনি ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের সচিব মার্কওয়েন মুলিনের কাছে চিঠি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় সরকারি নথি সংরক্ষণের বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা চেয়েছেন। পাশাপাশি গত দুই বছরে কমিটির পক্ষ থেকে চাওয়া বিভিন্ন তথ্য ও নথি সরবরাহের দাবিও জানিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার সম্প্রসারণ। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে এই সংস্থায় প্রায় ১২ হাজার নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির জনবল আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, তাঁদের প্রশিক্ষণের মান কেমন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কী নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে চান ডেমোক্র্যাটরা।
এ ছাড়া অভিবাসীদের আটক রাখার কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের আচরণ, চিকিৎসাসেবা, খাবার, নিরাপত্তা এবং আটক অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নতুন করে শুনানি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। অভিবাসন অভিযান পরিচালনার সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন এবং বেআইনি আটকের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এর আগে কংগ্রেসে সংখ্যালঘু অবস্থানে থেকেও ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ সংগ্রহ করেছেন। গত অক্টোবরে টেক্সাসের অস্টিনে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার কর্মকর্তাদের গুলির ঘটনা নিয়েও একটি শুনানি আয়োজন করেন তাঁরা। নতুন কংগ্রেসে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আরও বিস্তৃত তদন্তের সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় তদন্তের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। গত বছর এবং চলতি সময়ে অনুমোদিত বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন কার্যক্রমে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা সংস্থার কার্যক্রমে ব্যয় করা হচ্ছে।
কোন প্রকল্পে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, আটককেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার চুক্তি কীভাবে দেওয়া হয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থের অপচয় বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চান ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।
ব্লুমবার্গ ল-এর ৪ নভেম্বরের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে অভিবাসন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, আটককেন্দ্রের জন্য সরকারি চুক্তি এবং অভিবাসন কার্যক্রমে বরাদ্দ করা বিপুল অর্থের ব্যবহার।
এদিকে তদন্তের পরিধি শুধু অভিবাসন কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের অধীন সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এবং জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থায় কর্মী ছাঁটাই, নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের এই উদ্যোগের সামনে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হলেও সরাসরি সব অভিবাসন অভিযান বন্ধ করে দেওয়া সহজ হবে না। নতুন আইন পাস করতে হলে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে। তিনি কোনো আইন প্রত্যাখ্যান করলে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ হিসেবে স্টিফেন মিলারের প্রভাব এবং স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের সচিব মার্কওয়েন মুলিনের কঠোর অভিবাসননীতি অব্যাহত রাখার অবস্থান থেকে প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে।
ফলে আগামী বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে অভিবাসননীতি নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে ডেমোক্র্যাটরা জবাবদিহি ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলছেন, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্ত শুধু অভিবাসননীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতা, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করবে। আগামী কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত কতটা কার্যকর হয় এবং ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে এর জবাব দেয়, সেটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয়।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।