কানাডার পাসপোর্টের ছবিতে হিজাব-পাগড়ি পরা যাবে, মানতে হবে যেসব নিয়ম
কানাডার পাসপোর্টের ছবিতে হিজাব, পাগড়ি ও সাধারণ চশমার অনুমতি রয়েছে। তবে পরিচয় নিশ্চিত করতে মুখ দৃশ্যমান রাখাসহ মানতে হবে নির্দিষ্ট নিয়ম।
কানাডার পাসপোর্টের ছবি তোলার ক্ষেত্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখিয়ে হিজাব, পাগড়ি এবং অন্যান্য ধর্মীয় মাথার আবরণ ব্যবহারের সুযোগ রেখেছে দেশটির সরকার। শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ যেন নিজের পরিচয় ও বিশ্বাসের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য না হন, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই পাসপোর্টের ছবির নিয়মে এই সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে মুসলিম নারীদের হিজাব, শিখ ধর্মাবলম্বীদের পাগড়ি এবং অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসে নিয়মিত ব্যবহৃত মাথার আবরণ পরেও কানাডার পাসপোর্টের ছবি তোলা সম্ভব।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডার পাসপোর্টের ছবিতে হিজাব, পাগড়ি ও চশমা ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে একটি গ্রাফিক ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে কিছু তথ্য সঠিক থাকলেও কয়েকটি বিষয় নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চশমা পরা যাবে কি না, মুখের কতটুকু অংশ দৃশ্যমান রাখতে হবে এবং মুখ ঢাকা পোশাক পরে ছবি তোলা সম্ভব কি না, তা নিয়ে অনেকেই জানতে চাইছেন।
কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক বিভাগ এবং দেশটির সরকারি পাসপোর্ট কর্মসূচির প্রকাশিত নির্দেশিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ধর্মীয় ও চিকিৎসাজনিত কারণে প্রতিদিন ব্যবহার করা মাথার আবরণ পাসপোর্টের ছবিতে গ্রহণযোগ্য। তবে এর জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব নিয়ম শুধু কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষের জন্য নয়; ধর্মীয় বিশ্বাস বা চিকিৎসাজনিত কারণে নিয়মিত মাথা ঢেকে রাখেন এমন সবার জন্য প্রযোজ্য।
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, পাসপোর্টের ছবিতে মাথার আবরণ থাকলেও আবেদনকারীর সম্পূর্ণ মুখ স্পষ্টভাবে দেখা যেতে হবে। অর্থাৎ কপাল, চোখ, নাক, গাল, মুখ, চিবুক এবং মুখের দুই পাশের স্বাভাবিক গঠন শনাক্ত করার মতো অবস্থায় থাকতে হবে। মাথার আবরণ এমনভাবে পরতে হবে, যাতে মুখের কোনো অংশ ঢেকে না যায়। একই সঙ্গে কাপড়ের ভাঁজ, অতিরিক্ত অংশ কিংবা অন্য কোনো কারণে মুখের স্বাভাবিক অবয়ব আড়াল হওয়া চলবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাথার আবরণটি নিয়মিত ধর্মীয় বিশ্বাস অথবা চিকিৎসাজনিত কারণে ব্যবহার করা হতে হবে। শুধু পাসপোর্টের ছবি তোলার জন্য সাময়িকভাবে কোনো টুপি, কাপড় কিংবা অন্য মাথার আবরণ পরলে সেটি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। অর্থাৎ প্রতিদিনের ধর্মীয় বা চিকিৎসাজনিত ব্যবহারের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে হবে।
হিজাবের ক্ষেত্রে মুসলিম নারীরা স্বাভাবিক নিয়মে মাথা ও চুল ঢেকে ছবি তুলতে পারবেন। তবে মুখের চারপাশের অংশ স্পষ্ট থাকতে হবে। একইভাবে শিখ ধর্মাবলম্বীরা পাগড়ি পরেও ছবি তুলতে পারবেন। অন্য ধর্মের অনুসারীরাও নিজেদের নিয়মিত ধর্মীয় মাথার আবরণ ব্যবহার করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ছবিতে মুখ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে কি না, সেটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
ছবিতে আলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট শর্ত। মাথার আবরণের কারণে মুখের ওপর কোনো ছায়া পড়তে পারবে না। চোখ, নাক, গাল, কপাল কিংবা চিবুকের ওপর আলো-ছায়ার এমন পরিবর্তন থাকা যাবে না, যাতে মুখের স্বাভাবিক গঠন বুঝতে অসুবিধা হয়। ছবিতে আলো সমানভাবে পড়তে হবে এবং পেছনের অংশও পরিষ্কার রাখতে হবে।
অনেকের ধারণা, কানাডার পাসপোর্টের ছবি তুলতে হলে চশমা খুলে রাখতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রাফিকেও চশমা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এই দাবি সঠিক নয়। কানাডার সরকারি নির্দেশিকায় সাধারণ ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ব্যবহৃত চশমা পরে ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে।
তবে চশমার কাচে কোনো ধরনের আলো প্রতিফলিত হওয়া বা ঝলক থাকা যাবে না। আবেদনকারীর দুই চোখ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে হবে। চশমার ফ্রেম কিংবা কাচের কারণে চোখ আড়াল হলে ছবি গ্রহণযোগ্য হবে না। অন্যদিকে রোদচশমা এবং রঙিন কাচের চশমা গ্রহণ করা হয় না। এমনকি চোখ দেখা গেলেও রঙিন কাচের চশমা গ্রহণযোগ্য নয় বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে।
মুখ ঢেকে রাখা পোশাকের ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর। নিকাব বা বোরকা দিয়ে মুখের পরিচয় শনাক্ত করার মতো অংশ ঢেকে রেখে পাসপোর্টের ছবি তোলা যাবে না। কারণ পাসপোর্টের ছবি একজন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, সীমান্ত পারাপার এবং বিভিন্ন সরকারি কাজে এই ছবি ব্যবহার করা হয়। তাই আবেদনকারীর মুখের স্বাভাবিক গঠন স্পষ্ট থাকা জরুরি।
তবে ধর্মীয় কারণে কেউ মুখ ঢেকে রাখলে তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কানাডার অভিবাসন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ছবি তোলার সময় একই লিঙ্গের কর্মকর্তার সহায়তা চাওয়া যায়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্দা অথবা আলাদা গোপনীয় জায়গায় ছবি তোলার অনুরোধও করা যায়। অর্থাৎ মুখ শনাক্ত করার প্রয়োজনে ছবি তুলতে হলেও ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানোর সুযোগ রয়েছে।
এখানে পাসপোর্টের ছবি এবং অভিবাসনসংক্রান্ত আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি সংগ্রহের প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। পাসপোর্টের ছবি জমা দেওয়ার নিয়ম এক ধরনের, আর অভিবাসন আবেদনকারীদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ছবি ও আঙুলের ছাপ নেওয়ার নিয়ম আরেক ধরনের। তবে উভয় ক্ষেত্রেই মাথার আবরণ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, যদি মুখ সম্পূর্ণ দৃশ্যমান থাকে। অভিবাসনসংক্রান্ত ছবি তোলার সময় একই লিঙ্গের কর্মকর্তার সহায়তা ও ব্যক্তিগত পর্দার অনুরোধ করার বিষয়টি সরকারি নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাসপোর্টের ছবিতে মুখের অভিব্যক্তি কেমন হবে, সে বিষয়েও নিয়ম রয়েছে। আবেদনকারীকে ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকাতে হবে। দুই চোখ খোলা ও স্পষ্ট থাকতে হবে। মুখ বন্ধ রাখতে হবে এবং স্বাভাবিক নিরপেক্ষ অভিব্যক্তি বজায় রাখতে হবে। হাসি, ভ্রু কুঁচকানো কিংবা মুখের অস্বাভাবিক ভঙ্গি গ্রহণযোগ্য নয়। মুখ ও কাঁধ ক্যামেরার দিকে সোজা রাখতে হবে। মাথা একদিকে কাত করে কিংবা ঘুরিয়ে ছবি তোলা যাবে না।
ছবির মাপের ক্ষেত্রেও কানাডার নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ কাগজে জমা দেওয়া পাসপোর্টের ছবির প্রস্থ হতে হবে ৫০ মিলিমিটার এবং উচ্চতা ৭০ মিলিমিটার। চিবুক থেকে মাথার স্বাভাবিক সর্বোচ্চ অংশ পর্যন্ত মুখের উচ্চতা ছবিতে ৩১ থেকে ৩৬ মিলিমিটারের মধ্যে থাকতে হবে। অর্থাৎ শুধু মুখ পরিষ্কার থাকলেই হবে না, ছবির মাপও নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।