চেলসিতে আইসের উপস্থিতির খবরে স্কুলে শিশু পাঠানো বন্ধ করলেন কিছু অভিভাবক
স্কুলের সামনে অভিবাসন কর্মকর্তাদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়তেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন অনেক অভিভাবক।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের চেলসি শহরে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। স্কুলে যাওয়া-আসার সময় অভিবাসন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কয়েকটি পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকে। শিশুদের নিরাপত্তা এবং পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
৫ নভেম্বর প্রকাশিত এনবিসি বোস্টনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চেলসি পাবলিক স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলে শিক্ষার্থী আনা-নেওয়ার সময় আশপাশে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের উপস্থিতির খবর পাওয়ার পর পরিবারগুলোকে সতর্ক করে। বুধবার কয়েকটি স্কুলের কাছাকাছি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্কুল সুপারিনটেনডেন্ট আলমি আবেইতা।
পরিস্থিতি নিয়ে অভিভাবকদের অবহিত করতে স্কুল কর্তৃপক্ষ একটি সতর্কবার্তা পাঠায়। তবে কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল পরিবারগুলোকে আতঙ্কিত না করে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন রাখা। বৃহস্পতিবার সতর্কবার্তা পাঠানোর পর কিছু শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল বলে জানান সুপারিনটেনডেন্ট।
আলমি আবেইতা বলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো পরিবারের মধ্যে ভয় তৈরি হওয়া এবং সেই ভয়ের কারণে অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে স্কুলগুলোতে বাড়তি কর্মী রাখা হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চেলসির পাশের শহর রেভের বাসিন্দা কারমেন চিকাসও সন্তানের ভয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মেয়ে পরিবারের সদস্যদের আলাদা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করছে। মায়ের কাছে সে জানতে চেয়েছে, অভিবাসন কর্মকর্তারা তাদের কাউকে নিয়ে গেলে কী হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সন্তানকে মানসিকভাবে স্বাভাবিক রাখাও অভিভাবকদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় অভিবাসী অধিকার সংগঠন লা কলাবোরাতিভার নির্বাহী পরিচালক গ্লাডিস ভেগা জানিয়েছেন, চেলসি ও আশপাশের এলাকায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ ও খবর বেড়েছে। তাঁর সংগঠন শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোকে সহায়তা করার চেষ্টা করছে। স্কুল ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হেঁটে বের হওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে সংগঠনটি, যাতে শিশুরা নিজেদের একা বা অনিরাপদ মনে না করে।
এনবিসি বোস্টনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বুধবার চেলসির একটি এলাকায় অভিবাসন কর্মকর্তারা এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ওই ব্যক্তি নিজেকে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বলে পরিচয় দিয়েছেন এবং তাঁর অভিযোগ, জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
আইসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংস্থাটি স্কুলকে লক্ষ্যবস্তু করছে—এমন দাবি সঠিক নয়। তবে নির্দিষ্ট স্কুলের সামনে বা শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার স্থানে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে সংস্থার বক্তব্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
চেলসির বাইরেও কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ড্যানবেরি শহরে অভিবাসন অভিযান নিয়ে স্কুলশিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরির খবর প্রকাশিত হয়েছে। ৫ নভেম্বর প্রকাশিত কানেকটিকাট মিররের প্রতিবেদনে শিক্ষকরা জানান, আগস্টের শেষ দিকে আইসের অভিযানের পর কিছু শিক্ষার্থী নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বাড়ির বাইরে খেলতে যেতেও ভয় পাচ্ছিল।
ড্যানবেরির একটি স্কুলের শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযানের খবর শিক্ষার্থীদের আচরণ ও মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের সদস্যদের অভিবাসন অবস্থা অনিশ্চিত, তাদের সন্তানদের মধ্যে ভয় বেশি দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসনসংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্য শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষের পাঠানো আনুষ্ঠানিক বার্তা অনুসরণ করা, জরুরি যোগাযোগের তথ্য হালনাগাদ রাখা এবং সন্তানদের বয়স অনুযায়ী শান্তভাবে পরিস্থিতি বোঝানো জরুরি।
অভিভাবকদের মনে রাখা প্রয়োজন, স্কুলে আইসের উপস্থিতি নিয়ে কোনো খবর পাওয়া মানেই সব শিক্ষার্থী বা অভিভাবককে আটক করা হবে—এমন নয়। আবার কোনো নির্দিষ্ট শহরের ঘটনা পুরো যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোর পরিস্থিতি নির্দেশ করে না। স্থানীয় স্কুল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা নীতি এবং অভিবাসনসংক্রান্ত আইনি পরামর্শের ওপর নির্ভর করেই পরিবারগুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিবাসনসংক্রান্ত ভয় যেন শিশুদের নিয়মিত শিক্ষা, স্কুলে উপস্থিতি এবং মানসিক বিকাশে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। স্কুল, পরিবার ও স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।