অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
বাবাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার, সেই পরিবারের মেয়েই এবার নিউইয়র্কের সিনেটে
শৈশবে বাবাকে হারানোর অভিজ্ঞতা, অভিবাসন সংকট এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক আন্দোলন—সবকিছু পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন আবের কাওয়াস।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক আবের কাওয়াস। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটের ১২ নম্বর আসনে জয়ী হয়েছেন তিনি। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমেরিকান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন আবের। একই সঙ্গে তিনি হিজাব পরিহিত প্রথম নারী হিসেবে অঙ্গরাজ্যটির আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সিনেটের দায়িত্ব শুরু হচ্ছে না। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তিনি।
আবের কাওয়াসের এই বিজয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের ইতিহাস। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারের সন্তান হিসেবে জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাঁর। তাঁর বাবা-মা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। ছোটবেলায় পরিবারের ওপর অভিবাসনসংক্রান্ত সংকটের প্রভাব সরাসরি দেখেছেন তিনি। তাঁর বাবা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হওয়ার পর দেশটি থেকে বহিষ্কৃত হন। বাবার আটক ও বহিষ্কারের ঘটনা তাঁর শৈশব এবং পরবর্তী জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
নিজের নির্বাচনী প্রচারণার ওয়েবসাইটে আবের জানিয়েছেন, বাবাকে আটক ও বহিষ্কারের সময় তাঁদের পরিবারকে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই অভিবাসীদের অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।
তবে তাঁর বাবার বহিষ্কারের ঘটনা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও সামনে এসেছে। নিউইয়র্ক পোস্টের ২০২৬ সালের ২৪ জুনের প্রতিবেদনে আদালতের নথির বরাতে বলা হয়েছে, তাঁর বাবা আবদেলকারিম কাওয়াস যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে দুটি পৃথক প্রতারণাসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন। প্রতিবেদনে ১৯৯৫ সালের ভার্জিনিয়ার একটি মামলায় মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অপরাধে দণ্ড এবং ২০০৬ সালে নিউ জার্সিতে সম্পত্তির মূল্যসংক্রান্ত জালিয়াতির মামলায় দোষ স্বীকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলায় তাঁর তিন বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। পরবর্তী অভিবাসনসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৮ সালে তাঁকে জর্ডানে বহিষ্কার করা হয়। ফলে বাবার বহিষ্কারের বিষয়টি শুধু অভিবাসননীতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে এর সঙ্গে যুক্ত আদালতের নথিভুক্ত ঘটনাগুলোও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
আবের কাওয়াসের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠক হিসেবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে তিনি ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিউইয়র্কের শ্রমজীবী মানুষ, অভিবাসী, আরব ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, অভিবাসন সংস্কার, নাগরিক অধিকার এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারির বিরোধিতাসহ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তিনি।
নিউইয়র্কের কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস এবং আরবান জাস্টিস সেন্টারের সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারি ও বৈষম্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই সময়ের নাগরিক অধিকার আন্দোলনেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
২০২৬ সালের জুনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিউইয়র্কের স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য স্টিভেন রাগাকে পরাজিত করে দলীয় মনোনয়ন অর্জন করেন আবের। এরপর ৩ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হান-খোন তোকে পরাজিত করে সিনেট আসনটি নিশ্চিত করেন।
নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটের ১২ নম্বর নির্বাচনী এলাকার মধ্যে অ্যাস্টোরিয়া, সানিসাইড, উডসাইড, রিজউড, মাসপেথ, লং আইল্যান্ড সিটি, এলমহার্স্ট, গ্লেনডেল ও জ্যাকসন হাইটসের বিভিন্ন অংশ রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় আবেরের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল সাশ্রয়ী আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহন, অভিবাসীদের অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা। তিনি ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্য। নির্বাচনে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালাইবের সমর্থনও পেয়েছিলেন তিনি।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়ায় আবের লেখেন, ‘আমরা ইতিহাস তৈরি করেছি।’
তাঁর নির্বাচিত হওয়া শুধু একটি আসনে রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এবং মুসলিম নারীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে নির্বাচনী জয়কে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে তাঁকে এখন আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।
শৈশবে বাবার বহিষ্কারের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের সামাজিক আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে জয়—আবের কাওয়াসের এই পথচলা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোটের রায়, কংগ্রেসের দুই কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের দখলে

নির্বাচনে হারার ভয়ে ইসরায়েলে আশ্রয় নেওয়ার কথা বলে মজা করেন ট্রাম্পের দুই উপদেষ্টা

মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে, চাপে ট্রাম্প প্রশাসন







মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।