৭ নভেম্বরের আয়োজন ঘিরে প্রশ্ন, তিন বীর মুক্তিযোদ্ধার হত্যার বিচার কোথায়?
৭ নভেম্বরের মঞ্চে উৎসবের আয়োজন, ইতিহাসের পাতায় মুক্তিযোদ্ধা হত্যার রক্তচিহ্ন—তিন বীরের মৃত্যুর জবাব কোথায়?
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায়। দিনটিকে ঘিরে আজও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও কর্মসূচিতে রয়েছে স্পষ্ট বিভাজন। একদিকে বিএনপি পালন করছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’, অন্যদিকে জাসদ দিনটিকে ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখে। আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন দিনটিকে স্মরণ করে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একই দিনের ইতিহাস যখন এত ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আনে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে নিহত মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতি ও হত্যাকাণ্ডের বিচার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
বিএনপি ২০২৬ সালের ৫ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ৭ নভেম্বর সকাল ৬টায় দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১১টায় জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিকেল ৩টায় নয়াপল্টন থেকে বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি সারাদেশের জেলা ও মহানগর পর্যায়েও র্যালি এবং আলোচনা সভার কর্মসূচি রয়েছে।
সরকারও দিনটি উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে স্মারক আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ৭ নভেম্বরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করেছে এবং রাতে ‘দায়মুক্তি’ শীর্ষক একটি অনলাইন অনুষ্ঠান প্রচারের ঘোষণা দিয়েছে। জাসদের ঐতিহাসিক অবস্থানও এই দিনকে কেন্দ্র করে বিএনপির ব্যাখ্যা থেকে আলাদা।
তবে রাজনৈতিক কর্মসূচির এই ভিন্নতার মাঝেই চাপা পড়ে যায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের আরেকটি নির্মম অধ্যায়।
তিন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা বীর বিক্রম এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার বীর উত্তম নিহত হন।
তাঁরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অথচ স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় দেশের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে তাঁদের প্রাণ হারাতে হয়।
বিশেষ করে খালেদ মোশাররফ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সংগঠক। এ টি এম হায়দারও মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁদের মৃত্যু বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা সরাসরি জড়িত ছিল, কার নির্দেশে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল এবং এর পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নিষ্পত্তি কী—এসব প্রশ্নের উত্তর আজও জনপরিসরে বিতর্কের বিষয়।
রাজনৈতিক কর্মসূচি আছে, কিন্তু ইতিহাসের অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর কী হবে?
বিএনপির কাছে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতির দিন। দলটির কর্মসূচিতে জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার আয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে দিনটির বিকল্প ব্যাখ্যায় মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড এবং সেই ঘটনার বিচারহীনতার প্রশ্ন সামনে আসে।
এখানে প্রশ্নটি কোনো দলের দিবস পালন করার অধিকার নিয়ে নয়; বরং ইতিহাসের একটি দিনের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখার দায় নিয়ে।
যে দিনে একজন সামরিক কর্মকর্তা গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হন, সেই একই দিনের ঘটনাপ্রবাহে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনা কর্মকর্তারা নিহত হন। ইতিহাসের এই দুই বাস্তবতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাই প্রশ্ন—৭ নভেম্বরের কর্মসূচিতে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও স্মৃতিচারণের পাশাপাশি নিহত মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের স্মরণ, হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
শুধু র্যালি, পতাকা, পুষ্পস্তবক আর রাজনৈতিক বক্তব্যে কি একটি দিনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব? নাকি ইতিহাসের কিছু অধ্যায় রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী সামনে আসে, আর কিছু অধ্যায় থেকে যায় আড়ালে?
৭ নভেম্বরের ইতিহাস শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নয়; এটি মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের রক্ত, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অসমাপ্ত প্রশ্নেরও ইতিহাস।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।