হরমুজ উত্তেজনায় আমিরাতের একাধিক ফ্লাইট বাতিল, বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি বিমানযাত্রীর
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে আমিরাতের বিমান সংস্থাগুলো সময়সূচি পরিবর্তন করছে, সৌদিগামী কয়েকটি রুটে ফ্লাইট বাতিল ও যাত্রীদের সতর্কতা জারি।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন বিমান সংস্থা নির্দিষ্ট গন্তব্যে ফ্লাইট বাতিল, সময়সূচি পরিবর্তন এবং কিছু রুটে সাময়িক স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ থেকে যাতায়াতকারী যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
৭ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত গালফ নিউজের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমিরেটস, ইতিহাদ, ফ্লাইদুবাই ও এয়ার অ্যারাবিয়া তাদের বিভিন্ন রুটের কার্যক্রমে পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের কয়েকটি শহরের সঙ্গে বিমান যোগাযোগে বিধিনিষেধ ও বাতিলের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। তবে আমিরাতের সব বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যায়নি এবং সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও বাতিল করা হয়নি। নির্দিষ্ট গন্তব্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করেই বিমান সংস্থাগুলো পৃথক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
আবুধাবিভিত্তিক ইতিহাদ এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, আবুধাবি থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামগামী যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী ফ্লাইট ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত বাতিল রাখা হয়েছে। তবে জেদ্দাগামী নির্বাচিত কয়েকটি ফ্লাইট ৬ নভেম্বর থেকে পুনরায় চালুর সূচিতে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সৌদি আরবের সব শহরের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ নয়; বরং নির্দিষ্ট রুটে চলাচল সীমিত রয়েছে। পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে এই সময়সীমা ও সিদ্ধান্তও পরিবর্তিত হতে পারে।
দুবাইভিত্তিক এমিরেটসের ক্ষেত্রেও কয়েকটি সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলের তথ্য পাওয়া গেছে। দুবাই থেকে জেদ্দা এবং জেদ্দা থেকে দুবাইগামী নির্দিষ্ট কিছু ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে। তবে সংস্থাটির সব সৌদিগামী ফ্লাইট বন্ধ নেই। যাত্রীদের নির্দিষ্ট উড়োজাহাজের নম্বর দিয়ে যাত্রার আগে সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করতে বলা হয়েছে।
ফ্লাইদুবাইও সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনায় পরিবর্তন এনেছে। রিয়াদ, দাম্মাম ও আবহাগামী কয়েকটি ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল রয়েছে। অন্যদিকে কিছু গন্তব্যে চলাচল পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব পুনরায় চালুর তারিখকে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে।
শারজাহভিত্তিক এয়ার অ্যারাবিয়ার কয়েকটি রুটেও পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরগামী কিছু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তবে সব রুটে চলাচল বন্ধ হওয়ার তথ্য নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার যাত্রীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফ্লাইটের অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে আসা এবং বাংলাদেশ থেকে আমিরাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক যাত্রী দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে কোনো সংযোগকারী ফ্লাইট বাতিল হলে পরবর্তী যাত্রাও বিলম্বিত হতে পারে। তবে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশগামী সব ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, এমন দাবি করা যাচ্ছে না। একইভাবে ঢাকাগামী বা চট্টগ্রামগামী প্রতিটি নির্দিষ্ট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে বলেও নিশ্চিত তথ্য নেই।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই প্রণালির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে শুধু জাহাজ চলাচল নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। বিমান সংস্থাগুলো নিরাপদ আকাশপথ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প পথ ব্যবহার করতে পারে। এতে কোনো কোনো যাত্রার দূরত্ব ও সময় বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে প্রতিটি ফ্লাইট বাতিলের কারণ হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কোনো ফ্লাইট নিরাপত্তা নির্দেশনা, আকাশসীমার বিধিনিষেধ, পরিচালনাগত সমস্যা, কারিগরি ত্রুটি কিংবা সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরের পরিস্থিতির কারণেও বাতিল হতে পারে। তাই বাতিলের প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার বিজ্ঞপ্তি ও যাত্রীর টিকিটের তথ্য যাচাই করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থাও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা নিয়ে সতর্কতা অব্যাহত রেখেছে। ইউরোপীয় বিমান নিরাপত্তা সংস্থার ঝুঁকি নির্দেশনায় অঞ্চলটির কয়েকটি আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে বিমান সংস্থাগুলোকে যাত্রাপথ নির্ধারণের সময় নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আকাশসীমার অনুমতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করতে হচ্ছে।
এদিকে ইউরোপের কয়েকটি বিমান সংস্থা দুবাইগামী ফ্লাইট পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ নভেম্বরের শুরু থেকে দুবাইগামী সেবা চালু করেছে। অন্যদিকে লুফথানসা, সুইস ও ইউরোউইংসের মতো কয়েকটি সংস্থা নভেম্বরের শেষ দিকে কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইনসও ডিসেম্বর মাসে দুবাইগামী ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করেছে। তবে এসব তারিখ পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
বিমান চলাচলে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ ধরনের প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হয় এবং জাহাজ চলাচল কতটা বাধাগ্রস্ত হয় তার ওপর।
এ পরিস্থিতিতে আমিরাত থেকে বাংলাদেশে আসতে ইচ্ছুক যাত্রীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হচ্ছে। যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার ওয়েবসাইট, মুঠোফোনের অ্যাপ অথবা গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। শুধু টিকিট কাটা হয়েছে বলে নির্ধারিত সময়ে বিমান ছাড়বে, এমন নিশ্চয়তা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ফ্লাইট বাতিল হলে যাত্রীদের নিজে থেকে টিকিট বাতিল না করে বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকল্প ফ্লাইট, নতুন তারিখ নির্ধারণ এবং অর্থ ফেরতের নিয়ম জেনে নেওয়া প্রয়োজন। যাঁদের একাধিক সংযোগকারী ফ্লাইট রয়েছে, তাঁদের প্রতিটি যাত্রার সময়সূচি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে মুঠোফোনে বার্তা ও ইমেইল পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান যোগাযোগে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। তবে বিমান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কয়েকটি রুটে ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত থাকলেও অন্য অনেক রুটে কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের নিয়মিত তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।