কলেজে শিশু পরিচর্যার অনুদান কমায় বিপাকে যুক্তরাষ্ট্রের বহু নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থী-অভিভাবক
সন্তানকে নিরাপদে রেখে কলেজে পড়াশোনা করার সুযোগ হারাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। সরকারি অনুদান কমে যাওয়ায় শিশু পরিচর্যার খরচ বেড়েছে, ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের স্বপ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সন্তান লালন-পালন করছেন এমন নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পাসে শিশু পরিচর্যার খরচ কমাতে সহায়তা দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল কর্মসূচিতে অনুদান পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অনেক শিক্ষার্থী-অভিভাবক।
৬ নভেম্বর প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগের শিশু পরিচর্যা সহায়তা কর্মসূচি চাইল্ড কেয়ার অ্যাকসেস মিনস প্যারেন্টস ইন স্কুল বা সিসিএএমপিআইএসের আওতায় এবার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনুদান পেয়েছে।
কর্মসূচিটি মূলত নিম্ন আয়ের কলেজ শিক্ষার্থীদের সন্তানদের জন্য ক্যাম্পাসে অথবা আশপাশের এলাকায় স্বল্প খরচে শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে সহায়তা করে। এর মাধ্যমে সন্তানদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করে অভিভাবকেরা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার বছর মেয়াদি অনুদান দেওয়ার জন্য এবার ১৪৮টি কলেজকে অর্থায়নের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪০টি প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের আগের প্রতিযোগিতায় ৩২৭টি প্রতিষ্ঠান এই সহায়তা পেয়েছিল।
এবার প্রায় ৩০০টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনুদানের জন্য আবেদন করেছিল। এর মধ্যে ৭৯টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন মূল্যায়নে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তারপরও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান অনুদান পায়নি।
এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের জীবনে। টেক্সাসের অস্টিন কমিউনিটি কলেজের শিক্ষার্থী লারিসা সাউসিলো তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের জন্য কলেজের সন্ধ্যাকালীন শিশু পরিচর্যা কর্মসূচিতে জায়গা পেয়েছিলেন। তিনি নার্স হওয়ার লক্ষ্যে পড়াশোনা করছিলেন এবং দিনের বেলায় পূর্ণকালীন কাজ করতেন।
কিন্তু ফেডারেল অনুদান শেষ হয়ে যাওয়ার পর কলেজটি নতুন অর্থায়ন না পাওয়ায় মেয়ের পরিচর্যার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সন্ধ্যার পরীক্ষাগারভিত্তিক ক্লাস চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্স থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। এতে নার্সিং পেশায় যাওয়ার স্বপ্ন পূরণে অন্তত আরও একটি সেমিস্টার পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উইসকনসিনের ম্যাডিসন এরিয়া টেকনিক্যাল কলেজেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফেডারেল সহায়তা বন্ধ হওয়ায় কয়েকটি পরিবার শিশু পরিচর্যার সুযোগ নিতে পারেনি। কেউ কেউ সন্তানদের পরিচর্যার ব্যবস্থা কমিয়ে দিয়েছেন, আবার কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার কোর্সের সংখ্যাও কমিয়েছেন।
কলেজটির তথ্য অনুযায়ী, শিশু পরিচর্যার খরচ বহন করতে না পেরে কয়েকটি পরিবার তাদের নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে কিছু পরিবার বিকল্প অর্থায়নের অপেক্ষায় পরিচর্যা শুরু করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সফল আবেদনকারীদের চার বছরের অর্থায়ন একসঙ্গে দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যৎ বাজেট নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে প্রকল্পের মাঝপথে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে শিক্ষা সহায়তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, এই সিদ্ধান্তের কারণে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের জন্য উচ্চশিক্ষা শেষ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজনের সন্তান রয়েছে। অথচ সব কলেজে ক্যাম্পাসভিত্তিক শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা নেই। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠানে এই সুবিধা রয়েছে, সেখানে সরকারি সহায়তা কমে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে কলেজগুলো স্থানীয় সরকার, দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিকল্প সহায়তা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। তবে সরকারি অর্থায়নের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
যেসব শিক্ষার্থী এই সহায়তার ওপর নির্ভর করতেন, তাঁদের নিজ নিজ কলেজের শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, আর্থিক সহায়তা বিভাগ এবং শিক্ষার্থী সহায়তা দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যভিত্তিক শিশু পরিচর্যা সহায়তা বা স্থানীয় বৃত্তির সুযোগও যাচাই করা যেতে পারে।
শিক্ষা ও পরিবারের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো অভিভাবকদের জন্য এই পরিস্থিতি নতুন করে আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি করছে। অনেকের কাছে শিশু পরিচর্যার সুবিধা শুধু একটি সেবা নয়, বরং পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন পূরণের অন্যতম শর্ত।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।