নিউইয়র্কে দ্বিতীয় বাড়ির কর নিয়ে আদালতে জয় পেলেন মেয়র মামদানি, বাকি আইনি লড়াই বহাল
নিউইয়র্কের আপিল আদালতের রায়ে মামদানি প্রশাসন দ্বিতীয় বাড়ির কর কার্যক্রম চালাতে পারবে, তবে করের সাংবিধানিকতা নিয়ে পৃথক মামলা এখনো বিচারাধীন।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির জন্য বড় ধরনের আইনি স্বস্তি নিয়ে এসেছে দেশটির একটি আপিল আদালতের রায়। শহরের ধনীদের মালিকানাধীন দামি দ্বিতীয় বাড়ির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করা নিম্ন আদালতের আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারকেরা। বুধবার, ৪ নভেম্বরের এই রায় মামদানি প্রশাসনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে করটির বৈধতা নিয়ে চলমান সব আইনি বিরোধের অবসান ঘটেনি।
মামদানির প্রস্তাবিত এই কর মূলত নিউইয়র্ক শহরে থাকা ধনীদের বিলাসবহুল দ্বিতীয় বাড়ির ওপর অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা। যেসব ধনী ব্যক্তি শহরের বাইরে বসবাস করেন, কিন্তু নিউইয়র্কে অত্যন্ত মূল্যবান বাড়ি, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের মালিক, তাঁদের লক্ষ্য করেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করটির প্রচলিত নাম পিয়েদ-আ-তেরে কর। এর উদ্দেশ্য হলো শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস না করেও যাঁরা নিউইয়র্কের আবাসন সম্পদের মালিক, তাঁদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি মূল্যমানের নির্দিষ্ট দ্বিতীয় বাড়ি এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা কনডোমিনিয়াম ও সমবায় আবাসনের মালিকদের এই করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একক, দ্বৈত ও তিন পরিবারের বাড়ির ক্ষেত্রে পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে কনডোমিনিয়াম ও সমবায় আবাসনের জন্য আলাদা মূল্যসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে শহরের সব বাড়ির মালিককে এই কর দিতে হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
এই কর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের মে মাসে অঙ্গরাজ্যের বাজেটের অংশ হিসেবে করটি আইনে পরিণত হয়। মামদানি নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, শহরের আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতে এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা উন্নত করতে বিত্তবানদের আরও বেশি অবদান রাখা উচিত।
মামদানি প্রশাসনের প্রত্যাশা, এই কর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০ কোটি ডলার রাজস্ব পাওয়া যেতে পারে। এই অর্থ দিয়ে শহরের বিভিন্ন জনসেবা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, পার্ক রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে। নিউইয়র্ক শহরের বাজেট ঘাটতি মোকাবিলাতেও এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রশাসনের ধারণা।
তবে কর বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানা জটিলতা তৈরি হয়। শহরের অর্থ বিভাগ সম্ভাব্য করদাতাদের শনাক্ত করতে বিপুলসংখ্যক সম্পত্তির তথ্য প্রকাশ করে। প্রায় ৯ লাখ সম্পত্তির একটি তালিকা প্রকাশ এবং প্রায় ১৭ হাজার বাড়ির মালিককে সম্ভাব্য করের বিষয়ে নোটিশ পাঠানো হয়। এতে অনেক বাড়ির মালিক উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের দাবি ছিল, নিজেদের স্থায়ী বাসস্থান হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের বাড়ি সম্ভাব্য করের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কয়েকজন বাড়ির মালিক আদালতের শরণাপন্ন হন। তাঁদের অভিযোগ, শহর কর্তৃপক্ষ কর কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেনি। বিশেষ করে যাঁদের বাড়ি প্রকৃতপক্ষে স্থায়ী বাসস্থান, তাঁদের কাছ থেকে নিজেরাই করমুক্ত হওয়ার প্রমাণ চাওয়া অন্যায্য। সেপ্টেম্বর মাসে স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের একটি আদালত তাঁদের পক্ষে রায় দেন। ওই আদালত শহর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাঠানো এবং সম্পত্তির তালিকা প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান।
কিন্তু মামদানি প্রশাসন সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে। বুধবার আপিল বিভাগের চার বিচারকের একটি প্যানেল নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধু সম্ভাব্য করের নোটিশ পাওয়া বা সম্পত্তির তালিকায় নাম প্রকাশিত হওয়াই মামলা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যক্ষ ক্ষতির প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট নয়। আবেদনকারীরা তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নির্দিষ্ট ক্ষতি বা হয়রানির যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
এই রায়ের ফলে মামদানি প্রশাসনের জন্য কর কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পথ আরও সহজ হয়েছে। আদালত মূলত কর বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে করা নির্দিষ্ট অভিযোগের নিষ্পত্তি করেছেন। করটি নিজেই সংবিধানসম্মত কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ করটির বিরুদ্ধে আরও দুটি পৃথক আইনি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, নিউইয়র্কের বাইরে বসবাসকারী বাড়ির মালিকদের ওপর বিশেষভাবে এই কর আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সমান অধিকার এবং আন্তরাজ্য বাণিজ্যসংক্রান্ত বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। মামলাগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ধনকুবের ব্যবসায়ী স্টিভ উইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রস। তাঁদের পক্ষের আইনজীবীদের দাবি, অঙ্গরাজ্যের বাইরে বসবাসকারী সম্পত্তির মালিকদের আলাদা করে করের আওতায় আনা বৈষম্যমূলক।
এই পৃথক মামলাগুলোই এখন মামদানি প্রশাসনের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। করটির সাংবিধানিকতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি ডিসেম্বর মাসে হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ বুধবারের বিজয় প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যতে আদালতের আরও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে কর থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ শহরের অর্থ বিভাগে করমুক্তির জন্য আবেদন করা অনেক সম্পত্তির মালিককে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো সম্পত্তি করের আওতায় থাকবে এবং সেখান থেকে প্রতিবছর ৫০ কোটি ডলার আদায় সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
মামদানি অবশ্য এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তাঁর মতে, বিলাসবহুল দ্বিতীয় বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে ন্যায্য অবদান আদায় করা হলে শহরের সাধারণ বাসিন্দারা উপকৃত হবেন। অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, নতুন করের কারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমতে পারে এবং সম্পত্তির মালিকদের ওপর অযাচিত চাপ তৈরি হতে পারে।
নিউইয়র্কের রাজনীতিতে এই কর এখন শুধু রাজস্ব সংগ্রহের বিষয় নয়, বরং ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিরও প্রতীক হয়ে উঠেছে। মামদানি প্রশাসন এটিকে সাধারণ মানুষের জন্য নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিরোধীরা করটির আইনগত ভিত্তি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
৪ নভেম্বরের আদালতের রায় মামদানি প্রশাসনের জন্য বড় সাফল্য হলেও চূড়ান্ত বিজয় নয়। ডিসেম্বরের সাংবিধানিক শুনানি এবং বাকি মামলাগুলোর সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে নিউইয়র্কে ধনীদের দ্বিতীয় বাড়ির ওপর এই অতিরিক্ত কর দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকবে কি না।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।