ঢাকায় শুরু যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মেলা, ৪৩ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে বাড়ছে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা
ঢাকায় শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০তম বাণিজ্য মেলা। ৪৩টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীতে গুরুত্ব পাচ্ছে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা।
ঢাকায় শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০তম বাণিজ্য মেলা। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ, বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও পণ্য পরিচিত করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে ৪৩টি প্রতিষ্ঠান ও নতুন উদ্যোগ। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা হোটেলে ৫ নভেম্বর শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন চলবে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ এবং ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সহযোগিতায় এবারের বাণিজ্য মেলার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৬টি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি এবং সাতটি নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য, সেবা ও প্রযুক্তি প্রদর্শনের জন্য মোট ৬৩টি স্টল রাখা হয়েছে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, তিন দিনের এই প্রদর্শনীতে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম হতে পারে। ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, পেশাজীবী এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্য ও সেবা সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ তৈরি করবে।
এবারের আয়োজনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের দীর্ঘ পথচলার কারণে। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের বাণিজ্য মেলা আয়োজন করা হয়েছে। তিন দশক ধরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়াতে সংগঠনটি কাজ করছে।
প্রদর্শনীতে প্রথমবারের মতো বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতের জন্য আলাদা অঞ্চল রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা, ভোগ্যপণ্য, উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, শিক্ষা, উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অঞ্চলে নিজেদের কার্যক্রম তুলে ধরছে।
এই খাতভিত্তিক আয়োজনের ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট শিল্প খাতের পণ্য, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সমাধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আধুনিক প্রযুক্তি, চিকিৎসাসেবায় নতুন যন্ত্রপাতি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিভিন্ন সেবা বাংলাদেশের বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এবারের প্রদর্শনীতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা উদ্যোগ অঞ্চল রাখা হয়েছে। সেখানে সাতটি নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিজেদের উদ্ভাবন, পণ্য ও ব্যবসায়িক ধারণা তুলে ধরছে। এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য অংশীদারত্ব তৈরির সুযোগ পাচ্ছেন।
দর্শনার্থীদের জন্য থাকছে বিশেষ কেনাকাটার অঞ্চল। সেখানে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি ঐতিহ্য কর্নারে তুলে ধরা হচ্ছে বাণিজ্য মেলার তিন দশকের ইতিহাস এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে এই আয়োজনের ভূমিকা।
শুধু পণ্য প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এবারের আয়োজন। মেলার পাশাপাশি ছয়টি বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এসব আলোচনায় নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।
আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, নারীর নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের সুযোগ। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে আগ্রহীদের জন্য দেশটির সিলেক্ট ইউএসএ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা রাখা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা সম্প্রসারণের বিভিন্ন সুযোগ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারেন।
এবারের বাণিজ্য মেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বৈঠক, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আয়োজকদের আশা, এসব যোগাযোগ ভবিষ্যতে নতুন ব্যবসায়িক চুক্তি ও অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন মার্কিন কোম্পানিকে বাংলাদেশের বাজারে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন ১০ থেকে ১২টি মার্কিন কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী হলে সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে। ফলে এবারের বাণিজ্য মেলা শুধু পণ্য কেনাবেচার আয়োজন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরির একটি উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ রয়েছে। তাই নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, পণ্যের মান, উৎপাদনব্যবস্থা এবং নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের বাজার, ভোক্তা চাহিদা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পাবে।
প্রদর্শনীটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকছে। আগ্রহীদের অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে তিন দিন মেয়াদি প্রবেশপাস সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। একটি পাস দিয়ে ৫ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শনীতে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
এবারের ৩০তম যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মেলা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এই আয়োজনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রদর্শনীতে তৈরি হওয়া যোগাযোগগুলো ভবিষ্যতে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগে কতটা রূপ নেয় তার ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।