যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই গ্রিন কার্ড পাওয়া কঠিন হচ্ছে, নতুন নিয়মে বাড়ছে কড়াকড়ি
যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িক ভিসাধারীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার নিয়ম কঠোর হচ্ছে। নতুন নির্দেশনায় বাড়ছে যাচাই, তবে দেশেই আবেদন করার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িক ভিসা নিয়ে বসবাসকারী বিদেশিদের জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে। দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ২০২৬ সালের মে মাসের নতুন নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অবস্থান করে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী এবং পর্যটক ভিসায় আসা ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ২১ মে ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা কর্তৃপক্ষ নতুন নীতিগত স্মারক জারি করে। পরদিন ২২ মে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকে সাময়িক ভিসার মর্যাদা পরিবর্তন করে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া একটি বিশেষ সুবিধা। তাই প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে এবং আবেদনকারী এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নির্ধারণে তাঁর সামগ্রিক অভিবাসন ইতিহাস ও অন্যান্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে হবে।
কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, সাধারণ নিয়ম হিসেবে বিদেশে মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে অভিবাসী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই স্থায়ী বসবাসের আবেদন অনুমোদনের সুযোগ থাকবে।
এই ঘোষণার কারণে অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কোনো সাময়িক ভিসাধারী আর দেশটির ভেতরে থেকে গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে পারবেন না। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয়। নতুন নির্দেশনায় দেশটির ভেতরে থেকে আবেদন করার আইনি সুযোগ বাতিল করা হয়নি। বরং আবেদন অনুমোদনের ক্ষেত্রে অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিবেচনাধীন ক্ষমতার ব্যবহার এবং আবেদনকারীর অতীত কর্মকাণ্ডের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পাওয়ার জন্য সাধারণত দুটি প্রধান পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো দেশটির ভেতরে থেকে অবস্থান পরিবর্তনের আবেদন। দ্বিতীয়টি হলো নিজ দেশ অথবা নির্ধারিত বিদেশি মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অভিবাসী ভিসার আবেদন সম্পন্ন করা।
প্রথম পদ্ধতিতে আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই স্থায়ী বসবাসের অনুমতির আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণত নির্ধারিত আবেদনপত্রের মাধ্যমে নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জমা দিতে হয়। যোগ্যতা পূরণ করলে আবেদন চলাকালে কাজের অনুমতি এবং ভ্রমণের অনুমতির জন্যও আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় পদ্ধতিতে আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নির্ধারিত মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সাক্ষাৎকার দিতে হয়। অভিবাসী ভিসা অনুমোদিত হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পেতে পারেন।
নতুন নির্দেশনার পর দ্বিতীয় পদ্ধতিকে সাধারণ পথ হিসেবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রত্যেক বিদেশিকে অবিলম্বে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নীতিতে আবেদনকারীর অতীত অভিবাসন ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেউ আগে ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেছেন কি না, অনুমতি ছাড়া কাজ করেছেন কি না, নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করেছেন কি না কিংবা অভিবাসন আবেদনে ভুল তথ্য দিয়েছেন কি না, এসব বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থী ভিসায় আসা ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে পরে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করলে তাঁর পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হতে পারে। তবে শুধু শিক্ষার্থী ভিসায় এসেছেন বলেই তাঁর আবেদন বাতিল হবে, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম ঘোষণা করা হয়নি।
পর্যটক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা বাড়তে পারে। ভিসা নেওয়ার সময় যে উদ্দেশ্য দেখানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর তাঁর কর্মকাণ্ড সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা বিবেচনা করা হতে পারে। প্রবেশের সময় থেকেই স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা গোপন করা হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে এইচ-১বি এবং এল-১ ধরনের কিছু কর্মভিত্তিক ভিসার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। এসব ভিসায় দ্বৈত উদ্দেশ্যের স্বীকৃতি রয়েছে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে বসবাসের আগ্রহও রাখতে পারেন। তবে নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এসব ভিসাধারীর আবেদনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হবে না। তাঁদের ক্ষেত্রেও অন্যান্য যোগ্যতা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা হবে।
পরিবারের মাধ্যমে গ্রিন কার্ড পাওয়ার আবেদনকারীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মার্কিন নাগরিকের স্বামী বা স্ত্রী কিংবা নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আবেদনকারী ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকে আবেদন করার যোগ্য হতে পারেন। তবে তাঁর প্রবেশের ধরন, আইনগত অবস্থান এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের ২৪৫ নম্বর ধারায় দেশটির ভেতরে অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সাধারণভাবে আবেদনকারীকে বৈধভাবে পরীক্ষা করে প্রবেশ বা অনুমোদিতভাবে প্রবেশের শর্ত পূরণ করতে হয়। পাশাপাশি তাঁর জন্য অভিবাসী ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা এবং প্রয়োজনীয় ভিসা পাওয়ার সুযোগ থাকতে হয়।
তবে আইনে কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। মার্কিন নাগরিকের নিকটতম পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া বা অনুমতি ছাড়া কাজ করার মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুবিধা থাকতে পারে। আবার কিছু কর্মভিত্তিক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে এসব বিষয় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
নতুন নির্দেশনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুধু কোনো নেতিবাচক তথ্য না থাকলেই আবেদন অনুমোদনের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার জন্য কেন বিশেষ বিবেচনার যোগ্য, তার পক্ষে ইতিবাচক তথ্য ও প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের সদস্য থাকা, দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্রে অবদান, ভালো চরিত্র, মানবিক পরিস্থিতি এবং অন্যান্য ইতিবাচক বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। তবে এগুলোর কোনোটিই এককভাবে অনুমোদনের নিশ্চয়তা দেয় না।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বিষয়ক দপ্তর ২৬ মে প্রকাশিত ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, নতুন নির্দেশনা অবস্থান পরিবর্তনের আইনি যোগ্যতার শর্ত পরিবর্তন করেনি। একই সঙ্গে নতুন কোনো আবেদনপত্র বা নতুন আইনি শর্তও তৈরি করেনি। তবে আবেদন যাচাইয়ের সময় অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিবেচনাধীন ক্ষমতা ব্যবহারে এটি প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ আগে থেকেই আবেদন জমা দিয়েছেন, এমন ব্যক্তিদেরও নতুন নির্দেশনার প্রভাব বিবেচনা করতে হতে পারে। তবে শুধু নতুন নীতির কারণে পুরোনো আবেদন প্রত্যাহার করা, পরিবর্তন করা কিংবা নতুন করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফ্র্যাগোমেনের ২৪ মে প্রকাশিত বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, দেশটির ভেতরে থেকে গ্রিন কার্ডের আবেদন করার সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে আবেদনকারীর অভিবাসন ইতিহাস, অনুমতি ছাড়া কাজ, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন এবং সাময়িক ভিসায় প্রবেশের পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার পরিস্থিতি আরও গভীরভাবে বিবেচিত হতে পারে।
নতুন নীতির বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়েও এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। আবেদন অনুমোদনের হার কতটা কমবে, কোন ধরনের পরিস্থিতিকে বিশেষ ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং বিভিন্ন শ্রেণির আবেদনকারীর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, এসব বিষয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে আবেদন করলেও সব ক্ষেত্রে নিজ দেশে ফিরে সাক্ষাৎকার দেওয়া সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ১৫ জুলাই ২০২৬ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণভাবে অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকার আবেদনকারীর বসবাসের দেশ অথবা অনুরোধের ভিত্তিতে তাঁর জাতীয়তার দেশের নির্ধারিত কনস্যুলার এলাকায় নেওয়া হবে। কিছু বিশেষ মানবিক, চিকিৎসা বা পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও নতুন নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করছেন, চাকরি করছেন কিংবা পরিবারের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন—এমন ব্যক্তিদের নিজেদের পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে, অনুমতি ছাড়া কাজের ইতিহাস রয়েছে অথবা আগে কোনো অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে, তাঁদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন নির্দেশনা জারির পর আতঙ্কিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়া কিংবা আগে থেকে জমা দেওয়া আবেদন প্রত্যাহার করা উচিত নয়। কারণ দেশ ছেড়ে যাওয়ার ফলে কিছু আবেদনকারীর ক্ষেত্রে পুনরায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অবৈধভাবে অবস্থানের ইতিহাস থাকলে দেশত্যাগের আগে আইনি পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অভিবাসন আইনজীবীরা আবেদনকারীদের নিজেদের ভিসার ধরন, প্রবেশের কাগজপত্র, পারিবারিক সম্পর্ক, চাকরির ইতিহাস এবং পূর্ববর্তী অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মে মাসের নতুন নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িক ভিসাধারীদের জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়াকে কঠিন ও অনিশ্চিত করেছে। তবে দেশটির ভেতরে থেকে আবেদন করার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাই ‘আমেরিকায় থেকে আর গ্রিন কার্ডের আবেদন করা যাবে না’—এমন প্রচার সঠিক নয়। বরং নতুন বাস্তবতায় প্রত্যেক আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, আইনি যোগ্যতা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।