সরাসরি মানচিত্র, পূর্বাভাস ও জরিপের গড়: PoliAgg (CC BY-SA 4.0)

পূর্ণ ফলাফল, মানচিত্র ও জরিপ
ব্রেকিং
১০ সেকেন্ডের ভিডিওতে মিলল নয় বছর নিখোঁজ ছেলের খোঁজ, বাড়ি ফিরেও মাকে পেলেন না তিনিট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোটের রায়, কংগ্রেসের দুই কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের দখলেকলেজে শিশু পরিচর্যার অনুদান কমায় বিপাকে যুক্তরাষ্ট্রের বহু নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থী-অভিভাবকব্রুকলিনে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ গেল ৬ জনের, আহত ৯; তদন্তে দমকল বিভাগযুক্তরাষ্ট্রে থেকেই গ্রিন কার্ড পাওয়া কঠিন হচ্ছে, নতুন নিয়মে বাড়ছে কড়াকড়ি

টাঙ্গাইলের মেয়ে সোমা সৈয়দ এখন নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি ইতিহাস গড়লেন আজ

বারো বছর বয়সে দেশ ছেড়ে যাওয়া টাঙ্গাইলের মেয়ে সোমা সৈয়দ নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারপতি হয়ে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করলেন আজ

টাঙ্গাইলের মেয়ে সোমা সৈয়দ এখন নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি ইতিহাস গড়লেন আজ
টাঙ্গাইলের মেয়ে সোমা সৈয়দ এখন নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি ইতিহাস গড়লেন আজ

টাঙ্গাইলের একটি মেয়ের গল্প এখন সারা বিশ্বের বাংলাদেশিদের মুখে মুখে। তাঁর নাম সোমা সৈয়দ। বারো বছর বয়সে যে মেয়েটি বাবা মায়ের হাত ধরে দেশ ছেড়ে অচেনা দেশে পাড়ি দিয়েছিল, আজ সেই মেয়েটি নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি। এই অর্জন শুধু তাঁর একার নয়। এই অর্জন টাঙ্গাইলের, এই অর্জন বাংলাদেশের, এই অর্জন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির। এই অর্জন প্রমাণ করে, স্বপ্ন দেখলে, পরিশ্রম করলে, সততার সঙ্গে লেগে থাকলে কোনো বাধাই বড় নয়।

সোমা সৈয়দের জন্ম টাঙ্গাইলে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বিচারক। নাম আফতাব উদ্দিন সৈয়দ। তিনি একসময় ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মা ছিলেন একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। বাবা মা দুজনেই ছিলেন শিক্ষানুরাগী মানুষ। ঘরে সব সময় পড়াশোনার পরিবেশ ছিল। সততা, ন্যায়, মানুষের সেবা, এই মূল্যবোধগুলো তিনি ছোটবেলা থেকেই শিখেছেন। বাবার আদালতের গল্প শুনে বড় হয়েছেন। মানুষের জন্য ন্যায়বিচার কতটা জরুরি, তা তিনি ছোটবেলা থেকেই বুঝতেন। মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন ধৈর্য আর শৃঙ্খলা। এই দুই শিক্ষা তাঁর জীবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

মাত্র বারো বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি আমেরিকায় চলে যান। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন স্কুল, সবকিছুই ছিল অচেনা। অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু সোমা হাল ছাড়েননি। তিনি নিউইয়র্কের সরকারি স্কুলে ভর্তি হন। ধীরে ধীরে ভাষা শেখেন, পড়াশোনায় মন দেন। জ্যামাইকা হাইস্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর সিটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন। তারপর আলবেনি আইন বিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চ ডিগ্রি নেন। এই পথটি সহজ ছিল না। প্রবাসে টিকে থাকতে হলে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়। তাঁকে সেই পরিশ্রমই করতে হয়েছে। দিনের পর দিন লাইব্রেরিতে কাটিয়েছেন। রাত জেগে পড়েছেন। স্বপ্ন ছিল একটাই, একদিন আইনজীবী হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।

আইন পাস করার পর তিনি নিজেই নিজের আইন পেশা শুরু করেন। তিনি নানা ধরনের মামলা নিয়ে কাজ করেছেন। পারিবারিক মামলা, বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত মামলা, ব্যবসায়িক মামলা, অভিবাসন সংক্রান্ত মামলা, অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের আইনি কাজ, সবকিছুতেই তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি বিনা পারিশ্রমিকে গরিব মানুষের জন্য আইনি সহায়তা দিয়েছেন। সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সব সময় বলতেন, আইন শুধু বইয়ের পাতায় থাকার জন্য নয়, আইন মানুষের সেবার জন্য। এই মানসিকতাই তাঁকে সবার থেকে আলাদা করেছে। কুইন্সের সাধারণ মানুষ তাঁকে নিজেদের আপনজন বলে মনে করতে শুরু করে।

তিনি কুইন্স কাউন্টি নারী আইনজীবী সমিতির সভাপতি হন। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের প্রথম দক্ষিণ এশীয় এবং প্রথম মুসলিম নারী সভাপতি। এই দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি নারী আইনজীবীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন। নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান সুযোগ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য তিনি লড়াই করেন। তিনি নিউইয়র্ক রাজ্য আইনজীবী সমিতির আইনি পরামর্শ বিভাগের দায়িত্বও পালন করেন। এই কাজগুলো তাঁকে আইন অঙ্গনে পরিচিত করে তোলে। মানুষ তাঁকে একজন সৎ, সাহসী এবং মানবিক আইনজীবী হিসেবে চিনতে শুরু করে।

দুই হাজার একুশ সালে তিনি বড় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কুইন্সের নগর দেওয়ানি আদালতের বিচারক পদে নির্বাচনে দাঁড়ান। সেই নির্বাচন ছিল অত্যন্ত কঠিন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শক্তিশালী প্রার্থী। প্রাথমিক নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়ী হন। তিনি পেয়েছিলেন একানব্বই হাজার চল্লিশ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন আটাশি হাজার পাঁচশ আটান্ন ভোট। এরপর সাধারণ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হন। তিনি এক লাখ চৌত্রিশ হাজার নয়শ নিরানব্বই ভোট পান। এই জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাস গড়েন। তিনি হন নিউইয়র্ক রাজ্যে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিচারপতি। তিনি হন কুইন্স থেকে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী বিচারপতি। সেদিন কুইন্সের বাংলাদেশিরা রাস্তায় নেমে আনন্দ করেছিলেন।

বিচারক হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। দুই হাজার বাইশ সাল থেকে দুই হাজার তেইশ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যানহাটনের ফৌজদারি আদালতে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি ব্যস্ত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অভিযুক্তদের হাজিরা, জামিন, ছোট বড় ফৌজদারি মামলা, সবকিছু তিনি দক্ষতার সঙ্গে সামলান। দুই হাজার চব্বিশ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি কুইন্সের দেওয়ানি আদালতে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। সেখানে তিনি মানুষের দৈনন্দিন বিরোধ, বাড়ি ভাড়া, চুক্তি, পারিবারিক সমস্যা, এসব মামলার ন্যায়বিচার করেন। তিনি সব সময় চেষ্টা করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষ আদালতে এসে ভয় না পায়। তিনি চেয়েছেন, মানুষ যাতে বুঝতে পারে, আদালত মানুষের জন্য। বিচারপতি মানুষের শত্রু নয়, বন্ধু।

তিনি সমাজের জন্য কাজ করা কখনো বন্ধ করেননি। তিনি নিউইয়র্ক নগরের ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন কমিটির কুইন্স শাখার যুগ্ম সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি নগর দেওয়ানি আদালতের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সংক্রান্ত কমিটির সদস্য। তিনি এশীয় আমেরিকান বিচারক সমিতির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। এই সব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তিনি চেষ্টা করছেন, যাতে সব ধর্ম, সব বর্ণ, সব ভাষার মানুষ সমানভাবে ন্যায়বিচার পায়। তিনি বিশ্বাস করেন, বিচারকের আসনে বসে কোনো পক্ষপাত করা যায় না। সত্য আর প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

গত চতুর্থ নভেম্বর দুই হাজার পঁচিশ সালে তিনি আরও বড় ইতিহাস গড়েন। তিনি নিউইয়র্ক রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে তিনি প্রায় দুই লাখ ষাট হাজার ভোট পান। এই জয় শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়। এই জয় প্রমাণ করে, আমেরিকার মানুষ যোগ্যতাকে সম্মান করে। ধর্ম, বর্ণ, দেশ, এসবের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ ভালো মানুষকে বেছে নেয়। কুইন্সের মতো বৈচিত্র্যময় এলাকায় যেখানে সারা বিশ্বের মানুষ থাকে, সেখানে একজন বাংলাদেশি মুসলিম নারীর এই জয় সত্যিই অসাধারণ। এই জয় বাংলাদেশের জন্য গর্বের। এই জয় মুসলিম নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার।

তাঁর স্বামী মিজান চৌধুরী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তিনি তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং সমাজকর্মী। তিনি সব সময় স্ত্রীর পাশে ছিলেন। সংসার, সন্তান, সমাজ, সবকিছু সামলে সোমা এগিয়ে গেছেন। তাঁর পরিবার তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। টাঙ্গাইলের মানুষ আজ তাঁকে নিয়ে গর্ব করে। দেলদুয়ার উপজেলার মানুষ বলে, আমাদের মেয়ে আজ আমেরিকার বিচারপতি। এই কথাটি শুনলেই বুক ভরে যায়। টাঙ্গাইলের গ্রামের স্কুলগুলোতে এখন সোমার গল্প শোনানো হয়। মেয়েরা বলে, আমরাও একদিন সোমা আপার মতো হবো।

এই ঘটনা থেকে বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য বড় শিক্ষা আছে। মেয়ে বলে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। গ্রামের মেয়ে বলে কেউ ছোট নয়। সততা, পরিশ্রম আর স্বপ্ন থাকলে টাঙ্গাইলের গ্রাম থেকে নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত যাওয়া যায়। সোমা সৈয়দ সেই পথ দেখিয়ে দিলেন। তিনি প্রমাণ করলেন, মেয়েরা চাইলে সব পারে। ধর্ম পালন করে, নিজের সংস্কৃতিকে ধরে রেখে, নিজের শেকড়কে ভুলে না গিয়ে, বিশ্বের সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছানো যায়। তাঁর সাফল্য বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের জন্য আলোর বাতিঘর হয়ে থাকবে।

পরিশেষে বলা যায়, সোমা সৈয়দের এই অর্জন আমাদের সবাইকে মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মানুষের মেধা বিশ্বমানের। সুযোগ পেলে বাংলাদেশিরা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় সেরা হতে পারে। আজ টাঙ্গাইলের মেয়ে নিউইয়র্কের বিচারপতি। কাল হয়তো আরেকজন বাংলাদেশি মেয়ে আরও বড় জায়গায় যাবে। এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকুক। বাংলাদেশের নাম বিশ্বের দরবারে আরও উজ্জ্বল হোক। সোমা সৈয়দের জন্য রইল অনেক অনেক শুভকামনা।

ট্যাগ: সোমাসৈয়দটাঙ্গাইলনিউইয়র্কবিচারপতিবাংলাদেশ

প্রতিবেদক

CSB News USA

মন্তব্য ০

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সিএসবি নিউজ ইউএসএ ফলো করুন

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।