চাকরির বিজ্ঞাপনেই বেতন জানাতে হবে, যুক্তরাজ্যে নতুন আইন আনার উদ্যোগ সরকারের
চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতন উল্লেখ বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য সরকার, নতুন উদ্যোগে আবেদনকারীরা চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই জানতে পারবেন সম্ভাব্য উপার্জন।
যুক্তরাজ্যে চাকরির বাজারে স্বচ্ছতা বাড়াতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। এখন থেকে চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতনের পরিমাণ উল্লেখ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। তিনি বলেছেন, নতুন আইন কার্যকর হলে সব নিয়োগদাতাকে চাকরির বিজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট পদের বেতন অথবা বেতনের সীমা প্রকাশ করতে হবে। তবে আইন কার্যকর হওয়ার আগেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নিয়ম অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এ পরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকারের উদ্দেশ্য হলো, চাকরিপ্রার্থীরা যেন কোনো পদে আবেদন করার আগেই জানতে পারেন সেখানে কত টাকা বেতন দেওয়া হবে। বর্তমানে দেশটির অনেক প্রতিষ্ঠান চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতনের তথ্য উল্লেখ করে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বেতন কিংবা প্রতিযোগিতামূলক বেতনের কথা উল্লেখ করে। ফলে আবেদনকারীদের প্রকৃত বেতন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন, একজন তরুণ যখন কর্মজীবন শুরু করতে চান কিংবা কোনো অভিভাবক পরিবারের দায়িত্ব পালনের জন্য নতুন চাকরি খোঁজেন, তখন আবেদন করার আগেই তাঁর জানা উচিত সংশ্লিষ্ট চাকরিতে কত টাকা আয় করা সম্ভব। বেতন সম্পর্কে না জেনে চাকরির জন্য সময় ও শ্রম ব্যয় করা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য অযৌক্তিক। এ কারণেই সব নিয়োগদাতার জন্য চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতন প্রকাশ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হবে।
সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের মাত্র ৪১ শতাংশ নিয়োগদাতা নিয়মিত চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতনের সীমা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে মাত্র ১৮ শতাংশ নিয়োগদাতা সব সময় নির্দিষ্ট বেতনের পরিমাণ প্রকাশ করেন। ২০২৪ সালে পেশাগত উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। অর্থাৎ দেশটির অধিকাংশ চাকরিপ্রার্থী এখনো আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট পদের বেতন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান না।
নতুন আইন কার্যকর হলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করছে সরকার। বিশেষ করে যারা প্রথমবারের মতো চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে চান, তাদের জন্য উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন নতুন চাকরিপ্রার্থীকে যাতায়াত, বাসস্থান, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ বিবেচনা করেই চাকরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আগে থেকেই বেতনের তথ্য জানা থাকলে নিজের প্রয়োজন ও যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি বেছে নেওয়া সহজ হবে।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো নারী-পুরুষের বেতনবৈষম্য কমানো। যুক্তরাজ্য সরকারের মতে, নিয়োগের শুরুতেই বেতনের তথ্য প্রকাশ করা হলে একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বেতন পার্থক্য শনাক্ত করা সহজ হবে। বিশেষ করে নারীরা অনেক সময় চাকরির বেতন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে অসুবিধার মুখোমুখি হন। নিয়োগদাতা কত টাকা দিতে আগ্রহী, তা আগে থেকে জানা না থাকলে অনেকেই তুলনামূলক কম বেতনের প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেন।
সরকারের পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বেতন প্রকাশের বাধ্যবাধকতার পক্ষে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া গেছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরামর্শে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৪ শতাংশ এ প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সমর্থনের হার ছিল ৯৩ শতাংশ। সরকারের দাবি, বেতনের তথ্য প্রকাশ করা হলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং চাকরিপ্রার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
দেশটির নারী ও সমতা বিষয়ক মন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসনও এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতনের তথ্য না থাকলে একজন আবেদনকারী বুঝতে পারেন না, সেই চাকরি তাঁর জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে পারবে কি না। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কর্মজীবনের বাইরে থাকার পর যারা আবার কাজে ফিরতে চান, তাদের জন্য আগাম বেতনের তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নতুন আইন বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যবসায়ীদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সব চাকরির জন্য একটি নির্দিষ্ট বেতন নির্ধারণ করা সহজ নয়। কারণ একজন কর্মীর অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, দায়িত্ব এবং কাজের ধরন অনুযায়ী বেতন পরিবর্তিত হতে পারে। একই পদে নতুন ও অভিজ্ঞ কর্মীদের বেতনের মধ্যেও পার্থক্য থাকতে পারে। তাই বেতনের সীমা কীভাবে প্রকাশ করতে হবে, তা আইনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন হতে পারে। নিয়োগদাতাদের নিজেদের বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করতে হবে। একই ধরনের কাজের জন্য নতুন কর্মীকে যে বেতন দেওয়া হচ্ছে, বিদ্যমান কর্মীরা তার তুলনায় কত পাচ্ছেন, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ বেতনবৈষম্য প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সরকার জানিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে আইনটি কবে থেকে কার্যকর হবে, কোন ধরনের বেতনের তথ্য প্রকাশ করতে হবে এবং নিয়ম অমান্য করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ বর্তমানে চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতন প্রকাশের বিষয়টি নিয়োগদাতাদের জন্য নতুন আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়। সরকার তাদের এখন থেকেই স্বেচ্ছায় বেতনের তথ্য প্রকাশ করতে উৎসাহিত করছে।
এ উদ্যোগ দেশটির তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনারও অংশ। যুক্তরাজ্যে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। সরকার তাদের কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনতে নতুন সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ার বাধা কমানোর চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশিদের জন্যও যুক্তরাজ্যের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে যারা যুক্তরাজ্যে চাকরির সুযোগ খোঁজেন, তারা চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতনের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক হলে সংশ্লিষ্ট পদের সম্ভাব্য আয় সম্পর্কে আগেই ধারণা পাবেন। এতে আবেদন করার আগে জীবনযাত্রার ব্যয়, যাতায়াত খরচ এবং সম্ভাব্য সঞ্চয়ের হিসাব করা সহজ হবে। তবে এই আইন বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কোনো কাজের অনুমতি বা ভিসার নিশ্চয়তা দেবে না।
যুক্তরাজ্যের এই পরিকল্পনা দেশটির নিয়োগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। চাকরির বিজ্ঞাপনে বেতন প্রকাশ বাধ্যতামূলক হলে নিয়োগদাতা ও চাকরিপ্রার্থী উভয় পক্ষের মধ্যে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে বেতন নিয়ে অযথা দর-কষাকষি, সময়ের অপচয় এবং বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কত দ্রুত আইনটি সংসদে উপস্থাপন করে এবং বাস্তবে তা কীভাবে কার্যকর করে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।