বিশ্বমঞ্চে ড. ইউনূসের নেতৃত্ব, ১৯০ দেশের তরুণদের সম্মেলনে বাংলাদেশের উজ্জ্বল উপস্থিতি
দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে বিশ্ব তরুণ নেতৃত্ব সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য, শান্তি, জলবায়ু, সমতা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা।
নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব তরুণ নেতৃত্ব সম্মেলন ২০২৬-এ অংশ নিয়েছেন। বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা দুই হাজার দুই শতাধিক তরুণ নেতা, উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী ও পরিবর্তনকামী ব্যক্তিদের এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে একত্রিত করা হয়েছে। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা, তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ৩ নভেম্বর শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী এই সম্মেলন। আয়োজনটি চলবে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত।
আয়োজক সংস্থা ওয়ান ইয়ং ওয়ার্ল্ডের প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তাদের একজন হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার তালিকায় রয়েছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ৩ নভেম্বর কেপটাউনের গ্রিন পয়েন্ট অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া ৬ নভেম্বর ‘মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয় কী’ বিষয়েও তাঁর একটি বক্তব্যের কর্মসূচি রয়েছে।
এবারের সম্মেলনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জর্ডানের রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ, মোজাম্বিকের সাবেক ফার্স্ট লেডি ও নারী-শিশু অধিকারকর্মী গ্রাসা মাশেল, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক মারিয়া রেসা এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মানবাধিকারকর্মী তাওয়াক্কল কারমান। এ ছাড়া অস্কারজয়ী অভিনেতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ফরেস্ট হুইটেকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদেরও সম্মেলনে যুক্ত করা হয়েছে।
সম্মেলনের মূল লক্ষ্য শুধু বিভিন্ন দেশের তরুণদের একত্রিত করা নয়, বরং তাঁদের চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা। এ বছর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। বিষয়গুলো হলো শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক সমতা, স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তি ও মানবাধিকার।
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে। এসব সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের ওপর। অনেক দেশে বেকারত্ব, শিক্ষার অসম সুযোগ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। সম্মেলনে এসব সমস্যার সমাধানে তরুণদের অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষুদ্রঋণ, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ব্যবসা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা তৈরিতে তাঁর উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছে।
ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে জামানত ছাড়াই দরিদ্র মানুষের কাছে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
২০০৬ সালে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সামাজিক ব্যবসার ধারণায় মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি মানুষের সামাজিক সমস্যার সমাধানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তাঁর অভিজ্ঞতা সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্যও এবারের সম্মেলনের বিষয়গুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাঁদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশের তরুণরাও উপকৃত হতে পারেন।
বিশেষ করে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে তরুণদের নতুন দক্ষতা অর্জন, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এবং আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নতুন ব্যবসায়িক ধারণা বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের ধরন পরিবর্তন করছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কীভাবে তরুণদের প্রস্তুত করা যায়, তা নিয়েও সম্মেলনে আলোচনা হচ্ছে।
এবারের আয়োজন দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের সঙ্গেও বিশেষভাবে যুক্ত। ১৯৭৬ সালের সোয়েটো যুব অভ্যুত্থানের পঞ্চাশ বছর পূর্তির বছরে কেপটাউনে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে তরুণদের সেই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই এবারের সম্মেলনে তরুণদের অধিকার, নেতৃত্ব এবং সামাজিক পরিবর্তনে তাঁদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০১৩ সালে জোহানেসবার্গে সম্মেলন আয়োজনের পর ২০২৬ সালে আবার আফ্রিকার মাটিতে ফিরে এসেছে এই আন্তর্জাতিক আয়োজন।
সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের তরুণ প্রতিনিধিরা আলোচনা, কর্মশালা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছেন। আয়োজকদের লক্ষ্য, সম্মেলনে তৈরি হওয়া যোগাযোগ ও সহযোগিতা যেন আয়োজন শেষ হওয়ার পরও অব্যাহত থাকে এবং বাস্তব সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও তরুণ প্রজন্মকে একই মঞ্চে নিয়ে আসার মাধ্যমে এবারের সম্মেলন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ এবং দারিদ্র্য বিমোচনের অভিজ্ঞতাও আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পথ খুঁজে বের করাই এই সম্মেলনের মূল প্রত্যাশা।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।