ডাক বিভাগসহ ডেলিভারি খাতে হাজারো চাকরির সুযোগ, বেতন ঘণ্টায় ৩৫ ডলার
ডাক বিভাগে চাকরির সুযোগ বাড়ছে ডেলিভারি চালকদের বেতন বাড়ছে প্রবাসীরা আশায় দিন গুনছেন পরিবারে ফিরছে স্বস্তি ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে আত্মবিশ্বাস
যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগ ও ডেলিভারি খাতে এখন চাকরির বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। উৎসবের মৌসুম সামনে, অনলাইনে কেনাকাটা বাড়ছে, চিঠি আর পার্সেলের চাপ বাড়ছে। এই চাপ সামলাতে ডাক বিভাগ, কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান আর ট্রাক কোম্পানিগুলো একসঙ্গে প্রচুর লোক নিচ্ছে। যারা অনেকদিন ধরে চাকরি খুঁজছেন, যারা নতুন এসেছেন, যারা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে চান, সবার জন্যই এখন সুযোগ খুলে গেছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য এই খবরটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই খাতের কাজগুলোতে অভিজ্ঞতা ছাড়াই শুরু করা যায়, দ্রুত বেতন পাওয়া যায়, আর পরিশ্রম করলে দ্রুত উপরে ওঠা যায়।
মার্কিন ডাক বিভাগ সারা দেশে জরুরি ভিত্তিতে লোক নিচ্ছে। পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্যেই এখন পদ খালি আছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডাক বিলি করা কর্মী, ডাক বাছাই করা কর্মী, কাউন্টারে সেবা দেওয়া কর্মী আর গাড়ি চালকের পদে। ডাক বিলি করা কর্মীরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট এলাকায় হেঁটে বা গাড়িতে করে চিঠি ও পার্সেল পৌঁছে দেন। ডাক বাছাই করা কর্মীরা বড় বিতরণ কেন্দ্রে চিঠি ও পার্সেল আলাদা করেন, মেশিনে তোলেন, গাড়িতে তোলেন। কাউন্টারের কর্মীরা ডাকঘরে এসে সেবা নিতে আসা মানুষকে সাহায্য করেন। গাড়ি চালকেরা বড় বড় ট্রাকে করে এক ডাকঘর থেকে আরেক ডাকঘরে ডাক নিয়ে যান।
বেতনের দিক থেকে ডাক বিভাগের চাকরি এখন অনেক আকর্ষণীয়। স্থায়ী শহুরে ডাক বিলি কর্মীর শুরুর বেতন ঘণ্টায় ছাব্বিশ ডলারের বেশি। কোনো কোনো এলাকায় এই বেতন আরও বেশি। অস্থায়ীভাবে শুরু করা সহকারী ডাক বিলি কর্মীর বেতন ঘণ্টায় একুশ ডলারের আশপাশে। গ্রামের ডাক বিলি সহকারীর বেতন ঘণ্টায় একুশ ডলার থেকে তেইশ ডলারের মধ্যে। ডাক বাছাই সহকারীর বেতন ঘণ্টায় ঊনিশ ডলারের আশপাশে। তবে এই বেতন এলাকা, অভিজ্ঞতা আর কাজের সময়ের ওপর নির্ভর করে বদলায়। বড় শহরে বেতন একটু বেশি, ছোট শহরে একটু কম। রাতের শিফটে, ছুটির দিনে, উৎসবের সময়ে কাজ করলে অতিরিক্ত বেতন পাওয়া যায়। অনেক কর্মী মাসে নিয়মিত বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত সময়ের টাকা মিলিয়ে ভালো আয় করেন। কোনো কোনো বিজ্ঞাপনে ঘণ্টায় পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ ডলার পর্যন্ত আয়ের কথা বলা হয়। তবে এটা সব পদে নয়। এটা অভিজ্ঞ, স্থায়ী আর বেশি ঘণ্টা কাজ করা কর্মীদের ক্ষেত্রে হয়। তাই বিজ্ঞাপন দেখেই পুরো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। সরকারি চাকরির ওয়েবসাইটে নিজের এলাকার আসল বেতন দেখে নিতে হবে।
ডাক বিভাগের চাকরির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিরাপত্তা আর সুযোগ-সুবিধা। এটা কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি। তাই চাকরি হঠাৎ চলে যাওয়ার ভয় কম। স্থায়ী কর্মীরা স্বাস্থ্যবিমা, দাঁতের চিকিৎসা, চোখের চিকিৎসা, জীবনবিমা পান। অবসরের জন্য পেনশন ব্যবস্থা আছে। অবসর সঞ্চয় খাতে সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হয়। ছুটির দিনে বেতনসহ ছুটি পাওয়া যায়। অসুস্থ হলে ছুটি পাওয়া যায়। বছরে ছয়টি সরকারি ছুটিতে বেতন পাওয়া যায়। পোশাকের জন্য ভাতা দেওয়া হয়। পড়াশোনার জন্য ছাড় দেওয়া হয়। মোবাইল সেবায় ছাড় পাওয়া যায়। অস্থায়ী কর্মীরাও ধীরে ধীরে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পান। প্রথমে সহকারী হিসেবে ঢুকে পরে স্থায়ী কর্মী হওয়া যায়। স্থায়ী হলে বেতন, ছুটি আর সুবিধা সবই বাড়ে।
ডাক বিভাগে চাকরি পেতে হলে আঠারো বছর বয়স হতে হবে। ডাক বিভাগের পরীক্ষায় পাস করতে হবে। অপরাধের ইতিহাস যাচাই করা হবে। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে। ভারী চিঠির বস্তা তোলা, দাঁড়িয়ে কাজ করা, হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা—এসব করতে হতে পারে। চালকের পদে বৈধ চালকের লাইসেন্স লাগবে। নিরাপদে গাড়ি চালানোর ইতিহাস থাকতে হবে। সপ্তাহান্তে আর ছুটির দিনে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। আবেদনের জন্য কোনো টাকা লাগে না। কেউ যদি টাকা চায়, বুঝতে হবে সেটা ভুয়া। আসল আবেদন শুধু ডাক বিভাগের সরকারি চাকরির ওয়েবসাইটেই করতে হয়।
দ্বিতীয় বড় সুযোগ বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন গুদাম কর্মী, পার্সেল বাছাই কর্মী, প্যাকেট তোলা-নামানো কর্মী আর ডেলিভারি চালকের পদে প্রচুর লোক নেওয়া হচ্ছে। গুদাম কর্মীরা গুদামে প্যাকেট তোলেন, নামান, স্ক্যান করেন, আলাদা করেন, গাড়িতে তোলেন। ডেলিভারি চালকেরা নির্দিষ্ট এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্যাকেট পৌঁছে দেন। এই কাজগুলো শারীরিকভাবে কষ্টের, কিন্তু বেতন নিয়মিত।
বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে গুদাম কর্মীর বেতন ঘণ্টায় সতেরো থেকে বাইশ ডলারের মধ্যে। কোনো কোনো জায়গায় শুরুতে বিশ ডলারের বেশি দেওয়া হচ্ছে। রাতের শিফটে, ভোরের শিফটে, উৎসবের মৌসুমে ঘণ্টায় দুই ডলার পর্যন্ত বাড়তি টাকা দেওয়া হচ্ছে। ডেলিভারি চালক ও কুরিয়ার চালকের বেতন ঘণ্টায় বিশ থেকে আটাশ ডলার পর্যন্ত। কোনো কোনো পদে ঘণ্টায় বিশ থেকে সাতাশ ডলার পর্যন্ত বেতন দেওয়া হচ্ছে। পার্টটাইম কাজ করলে সপ্তাহে বিশ থেকে ত্রিশ ঘণ্টা কাজ করা যায়। ফুলটাইম কাজ করলে সপ্তাহে চল্লিশ ঘণ্টার বেশি কাজ করে অতিরিক্ত বেতন পাওয়া যায়। বেতন সপ্তাহে সপ্তাহে দেওয়া হয়, যা অনেক পরিবারের জন্য বড় সুবিধা।
এই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবিধাগুলোও ভালো। স্থায়ী কর্মীরা চাকরির প্রথম দিন থেকেই স্বাস্থ্যবিমা, দাঁতের চিকিৎসা, চোখের চিকিৎসার সুযোগ পান। পার্টটাইম কর্মীরা একানব্বই দিন কাজ করার পর সুবিধা পান। বছরে পাঁচ হাজার দুইশো পঞ্চাশ ডলার পর্যন্ত পড়াশোনার খরচ দেওয়া হয়। এটা দিয়ে অনেকে ইংরেজি কোর্স, কম্পিউটার কোর্স, চালকের লাইসেন্সের কোর্স করেন। গুদাম থেকে শুরু করে চালক, চালক থেকে সুপারভাইজার, সুপারভাইজার থেকে ম্যানেজার—উপরে ওঠার রাস্তা খোলা আছে। আবেদন করার এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে চাকরি শুরু করা যায়। সাক্ষাৎকার ছোট হয়, কাগজপত্র কম লাগে।
তৃতীয় বড় সুযোগ ট্রাক চালকের চাকরিতে। যুক্তরাষ্ট্রে এখন ট্রাক চালকের অনেক অভাব। বড় বড় ট্রাক কোম্পানি সারা দেশে চালক খুঁজছে। নতুন চালকদের জন্য এটা সোনালি সুযোগ। প্রথম বছরেই একজন চালক আটচল্লিশ হাজার থেকে আটান্ন হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারেন। অভিজ্ঞ চালকরা বছরে পঁচান্ন হাজার থেকে পঁচাশি হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করেন। কোনো কোনো আঞ্চলিক পদে বছরে সত্তর হাজার থেকে বিরাশি হাজার ডলার পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। দল বেঁধে চালালে আয় আরও বেশি। দলগত চালকদের প্রতিজন সপ্তাহে চৌদ্দশো থেকে দুই হাজার পঁচাশি ডলার পর্যন্ত আয় করেন। বছরে হিসাব করলে এটা বাহাত্তর হাজার থেকে এক লাখ আট হাজার ডলারের বেশি।
ট্রাক চালকদের জন্য যোগদান বোনাসও দেওয়া হচ্ছে। বড় কোম্পানিগুলো সাধারণত তিন হাজার থেকে ছয় হাজার ডলার পর্যন্ত যোগদান বোনাস দেয়। কোনো কোনো বিশেষ রুটে পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার ডলার পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হচ্ছে। বিপজ্জনক মাল পরিবহনের অনুমতি থাকলে বা এক বছর অভিজ্ঞতা থাকলে পনেরো হাজার থেকে বিশ হাজার ডলার পর্যন্ত বোনাসের বিজ্ঞাপনও দেখা যাচ্ছে। তবে বোনাস একসঙ্গে দেওয়া হয় না। ধাপে ধাপে দেওয়া হয়। যেমন প্রথম যাত্রার পর সাতশো পঞ্চাশ ডলার, ত্রিশ দিন পর সাতশো পঞ্চাশ ডলার, ষাট দিন পর এক হাজার ডলার। কেউ যদি বন্ধুকে চাকরিতে আনেন, তাহলে রেফারেল বোনাস হিসেবে তিন হাজার ডলার পর্যন্ত পেতে পারেন।
ট্রাক চালক হতে হলে ভারী গাড়ির লাইসেন্স লাগবে। এই লাইসেন্সের প্রশিক্ষণের খরচ চার হাজার থেকে বারো হাজার ডলারের মধ্যে। সাধারণত সাড়ে চার হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ডলারে প্রশিক্ষণ শেষ করা যায়। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা আর লাইসেন্সের ফি যোগ হয়। অনেক কোম্পানি প্রশিক্ষণের খরচ পরে বেতন থেকে কেটে নেয় বা বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেয়। তবে শর্ত থাকে, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেই কোম্পানিতে কাজ করতে হবে। চালকদের প্রতিদিন দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকতে হয়। বাড়ি থেকে দূরে থাকতে হয়। তাই এই চাকরি নেওয়ার আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা দরকার। যারা একা থাকেন, যারা ভ্রমণ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই চাকরি খুব ভালো।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য কিছু বিশেষ পরামর্শ আছে। প্রথমত, বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি থাকতে হবে। কাগজপত্র ছাড়া কেউ চাকরি দেবে না। ডাক বিভাগ, কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান, ট্রাক কোম্পানি—সবাই প্রথমে কাজের অনুমতি যাচাই করে। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি বলা ও লেখা জানতে হবে। ঠিকানা পড়া, গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলা, ফর্ম পূরণ করা—সবকিছুতেই ইংরেজি লাগে। তৃতীয়ত, চালকের লাইসেন্স থাকলে সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। ডাক বিলি, ডেলিভারি, ট্রাক—সবখানেই চালকের চাহিদা বেশি। চতুর্থত, শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। পঞ্চাশ পাউন্ড পর্যন্ত প্যাকেট তুলতে হতে পারে। সারাদিন দাঁড়িয়ে, হেঁটে, গাড়ি চালিয়ে কাজ করতে হতে পারে। পঞ্চমত, কোনো প্রতিষ্ঠানকে আবেদন, প্রশিক্ষণ, পোশাক বা চাকরির জন্য টাকা দেবেন না। আসল প্রতিষ্ঠান কখনো টাকা চায় না।
যারা আবেদন করতে চান, তারা প্রতিদিন নিজের এলাকার ডাকঘরে, গুদামে, বিতরণ কেন্দ্রে খোঁজ রাখুন। সরকারি চাকরির ওয়েবসাইটে, কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের চাকরির ওয়েবসাইটে, ট্রাক কোম্পানির চাকরির পাতায় আবেদন করুন। জীবনবৃত্তান্ত ছোট, পরিষ্কার আর সত্য রাখুন। আগের কাজ, দক্ষতা, লাইসেন্স, ভাষা—সব পরিষ্কার করে লিখুন। সাক্ষাৎকারে সময়মতো যান। পরিষ্কার পোশাক পরুন। আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলুন। কাজের সময়, বেতন, ছুটি, বোনাস, স্বাস্থ্যবিমা—সবকিছু আগেই জেনে নিন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডাক বিভাগ ও ডেলিভারি খাতে এখন সত্যিকারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। চাকরি আছে, বেতন বাড়ছে, সুবিধা বাড়ছে, উপরে ওঠার রাস্তা খোলা আছে। তবে এই সুযোগ নিতে হলে দ্রুত আবেদন করতে হবে। কারণ উৎসবের মৌসুমে পদগুলো দ্রুত পূরণ হয়ে যায়। যারা এখন আবেদন করবেন, তারাই আগে সুযোগ পাবেন। যারা দেরি করবেন, তারা ভালো পদগুলো হারিয়ে ফেলবেন। তাই আজই খোঁজ নিন, আজই আবেদন করুন। পরিশ্রম, সততা আর ধৈর্য থাকলে এই চাকরিই হতে পারে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার শুরু।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।