ঢাকা মেডিকেলে দুদকের অভিযানে অনিয়মের চিত্র, স্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে বাড়ছে জনমনে প্রশ্ন
ঢাকা মেডিকেলে পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছে দুদক, বারবার অভিযানেও অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে কি না প্রশ্ন।
দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসাসেবা ঘিরে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযানে রোগীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায় এবং দ্রুত সেবা দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। তবে বারবার অভিযান পরিচালনার পরও এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের বিভিন্ন সময়ের অভিযানসংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ২৯ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান চালায় কমিশনের একটি দল। এক্স-রে, এমআরআই ও সিটি স্ক্যান পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানের সময় কমিশনের কর্মকর্তারা দেখতে পান, এক্স-রে পরীক্ষার ক্ষেত্রে রসিদের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এমআরআই ও সিটি স্ক্যান পরীক্ষার ক্ষেত্রেও রসিদ ছাড়া টাকা নেওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। হাসপাতালের কিছু আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠে আসে।
ওই সময় হাসপাতালের পরিচালক অভিযুক্ত আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং যেসব সেবার মূল্যতালিকা প্রদর্শিত ছিল না, সেগুলো প্রকাশ্যে টাঙানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। বিষয়টি সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এরপর ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট আবারও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন। রোগীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় এবং দালালদের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কমিশনের কর্মকর্তারা ছদ্মবেশে হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সেই অভিযানের মধ্য দিয়ে হাসপাতালের সেবাব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ আবারও সামনে আসে। বিশেষ করে সাধারণ রোগীদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত সেবা দেওয়ার কথা বলে অর্থ আদায়ের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ তৈরি করে।
সবচেয়ে স্পষ্টভাবে অনিয়মের চিত্র উঠে আসে ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির অভিযানে। ওই দিন দুর্নীতি দমন কমিশনের এনফোর্সমেন্ট দল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে। রোগীদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়েছিল।
কমিশনের কর্মকর্তারা ছদ্মবেশে হাসপাতালে অবস্থান করে বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পান বলে সংবাদমাধ্যমকে জানান। অভিযানে রেডিওলজি বিভাগের কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। পাশাপাশি কিছু আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে দ্রুত সেবা দেওয়ার কথা বলে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে আসে।
অভিযানের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কমিশনের দল। হাসপাতালের পরিচালক অনিয়মের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সংগৃহীত তথ্য পর্যালোচনা করে কমিশনের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল।
এদিকে ২০২৫ সালের ৬ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালালবিরোধী যৌথ অভিযান চালিয়ে ৩৩ জনকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়। রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা ও হয়রানির অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের ৪ মে হাসপাতালটিতে আবারও দালালবিরোধী অভিযান চালানোর খবর প্রকাশ করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। এসব ঘটনায় বোঝা যায়, হাসপাতালটির সেবাব্যবস্থায় দালালচক্র ও রোগী হয়রানির অভিযোগ এখনো আলোচনায় রয়েছে।
তবে এসব অভিযান একই সংস্থার পরিচালিত নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং অন্যান্য সংস্থার কার্যক্রমকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক একটি দাবিতে বলা হচ্ছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা নিজেরা ঢাকা মেডিকেলে অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং এটি কমিশনের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদন ও প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এই নির্দিষ্ট দাবি নিশ্চিত করা যায়নি। তাই চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সরাসরি অংশগ্রহণ কিংবা ঘটনাটিকে ইতিহাসের প্রথম অভিযান হিসেবে উল্লেখ করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। অনেকেই দূরবর্তী জেলা থেকে স্বল্প অর্থ নিয়ে রাজধানীতে আসেন। তাঁদের কাছে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া শুধু প্রয়োজন নয়, অনেক সময় শেষ ভরসাও।
এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভর্তি, শয্যা পাওয়া কিংবা দ্রুত চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা। দালালদের দৌরাত্ম্য এবং সেবার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ বন্ধ করতে না পারলে সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগের নির্ধারিত ফির তালিকা প্রকাশ্যে প্রদর্শন, সব লেনদেনে রসিদ দেওয়া, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযানের পর কী পরিবর্তন হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। একই ধরনের অভিযোগ বারবার পাওয়া গেলে শুধু সতর্কবার্তা নয়, প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি।
ঢাকা মেডিকেলে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে মানুষের প্রত্যাশা খুবই সাধারণ চিকিৎসা নিতে এসে কাউকে যেন অতিরিক্ত টাকা দিতে না হয়, দালালের কাছে অসহায় হতে না হয় এবং সরকারি সেবা পেতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয়।
অতএব, দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযান কতটা সফল, তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন হাসপাতালের সাধারণ রোগীরা বাস্তবে হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ চিকিৎসাসেবা পাবেন।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।